জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ায় বাংলাদেশের মানুষের কর্মঘণ্টা ও আয় কমবে। একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয় বাড়বে বলে এক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বড় পরিসর, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের উচ্চ হার এবং সীমিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কারণে তাপপ্রবাহের অর্থনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশে আরও তীব্র হতে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা।
জার্মানিভিত্তিক জলবায়ু, পরিবেশ ও উন্নয়নবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলফি গ্লোবাল গতকাল রোববার প্রকাশিত ‘হিট, হেলথ অ্যান্ড দ্য ইনক্রিজিং কস্টস অব লিভিং: এ কল ফর অ্যাকশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা তাপজনিত কারণে বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭৫ কর্মদিবস হারাতে পারেন। বর্তমানে এ দুই খাতে কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
সব খাত মিলিয়ে একই সময়ে কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ হতে পারে। অসুস্থতাজনিত ছুটি, স্বাস্থ্য বীমা বা আয় সুরক্ষার সুযোগ না থাকায় অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় বাংলাদেশকে তাপপ্রবাহের অর্থনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে পরিচালিত এ গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপপ্রবাহ কীভাবে একদিকে মানুষের আয় কমায়, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
স্বাস্থ্য ব্যয়ের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশই মানুষকে নিজস্ব অর্থে বহন করতে হয়েছে, যা গবেষণাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। ২০০০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে মাথাপিছু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় ৮৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তাপপ্রবাহজনিত অসুস্থতা বাড়লে এ চাপ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০৩৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল উচ্চ থেকে অতি উচ্চ আর্দ্রতাজনিত তাপঝুঁকির মধ্যে থাকবে। এ সময়ে বছরে ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকতে পারে। চরম তাপপ্রবাহের সময় কিছু খাতে উৎপাদনশীলতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কৃষি খাতে কর্মরত প্রায় সব নারীই অনানুষ্ঠানিকভাবে নিয়োজিত। নির্মাণসহ অন্যান্য তাপঝুঁকিপূর্ণ খাতেও অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের হার বেশি। ফলে অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা কমে গেলে এসব শ্রমিকের আয়ও সরাসরি কমে যায়।
অ্যাডেলফি গ্লোবালের হিসাবে, ২০২৪ সালে চরম তাপপ্রবাহের কারণে শ্রমঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতা কমে বাংলাদেশে সম্ভাব্য আয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় দুই হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশের সমান।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহের সময় বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট কর্মক্ষেত্র, কারখানা ও আবাসিক এলাকায় মানুষের তাপঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে। এ পরিস্থিতিতে জলবায়ু অভিযোজন, জনস্বাস্থ্য ও শ্রমনীতিকে সমন্বিতভাবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিবেদনে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের ওপর নির্ভরতা কমানো, তাপপ্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা ও শ্রম অধিকার সম্প্রসারণ, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় তাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করা এবং স্বাস্থ্য ও শ্রমিক সুরক্ষায় জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
এ জাতীয় আরো খবর..