স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের অধীনে আর্জেন্টিনা: ইতিহাসের অজানা অধ্যায়

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-১৯, | ২৩:৩৪:১৪ |

ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও স্পেন। মাঠের লড়াইয়ে দুই দলই শিরোপার দাবিদার হলেও এই দ্বৈরথের পেছনে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন এক ইতিহাস। একসময় যে আর্জেন্টিনা ছিল স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের অধীন, সেই দেশই আজ বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তি হয়ে স্পেনের বিপক্ষে নামছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ম্যাচে।

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ফাইনাল শুধু একটি ট্রফির লড়াই নয়, এটি দুই ভিন্ন ফুটবল সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক পথচলারও প্রতীক। একদিকে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ২০১০ সালের পর আবারও বিশ্বসেরা হওয়ার লক্ষ্যে মাঠে নামবে স্পেন।

স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের অধীনে আর্জেন্টিনা
আজকের স্বাধীন আর্জেন্টিনা একসময় ছিল স্পেনের গুরুত্বপূর্ণ উপনিবেশ। ষোড়শ শতাব্দী থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত প্রায় তিন শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলে স্পেন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল।

স্প্যানিশ শাসনের সময়েই আর্জেন্টিনার ভাষা, প্রশাসন ও সংস্কৃতির ওপর ইউরোপীয় প্রভাব বিস্তার লাভ করে। দেশটির বর্তমান সামাজিক কাঠামোর অনেক অংশের ভিত্তিও তৈরি হয় সেই সময়।

কীভাবে শুরু হয়েছিল স্পেনের শাসন?

১৫১৬ সালে স্প্যানিশ অভিযাত্রী হুয়ান দিয়াস দে সোলিস রিও দে লা প্লাতা অঞ্চলে পৌঁছান। এরপর ধীরে ধীরে এই এলাকায় স্পেনের প্রভাব বাড়তে থাকে।

১৫৮০ সালে বুয়েনস আইরেস পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর অঞ্চলটিতে স্প্যানিশ নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও ইউরোপীয় বসতির মিশ্রণে গড়ে ওঠে নতুন ঔপনিবেশিক সমাজ।

ভাইসরয়ালটি অব রিও দে লা প্লাতা

১৭৭৬ সালে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরও সহজ করতে স্পেন ‘ভাইসরয়ালটি অব রিও দে লা প্লাতা’ প্রতিষ্ঠা করে। এর রাজধানী ছিল বুয়েনস আইরেস। বর্তমান আর্জেন্টিনা ছাড়াও উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে ও বলিভিয়ার বড় অংশ এই প্রশাসনিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত ছিল।

বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, কর ব্যবস্থা ও সামরিক শক্তির মাধ্যমে স্পেন দীর্ঘদিন এই অঞ্চলে আধিপত্য ধরে রাখে।

স্বাধীনতার পথে আর্জেন্টিনা

আঠারো শতকের শেষ ভাগে ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবর্তন, আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলন ও ফরাসি বিপ্লবের চিন্তাধারা লাতিন আমেরিকাতেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে।

১৮১০ সালের মে বিপ্লব আর্জেন্টিনার স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়। বুয়েনস আইরেসে স্প্যানিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়, যা পরে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে রূপ নেয়।

অবশেষে ৯ জুলাই ১৮১৬ সালে তুকুমান কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে আর্জেন্টিনা। দীর্ঘ সংগ্রামের পর স্প্যানিশ শাসনের অবসান ঘটে।

ইতিহাসের প্রভাব এখনও রয়েছে

স্বাধীনতার দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পরও আর্জেন্টিনায় স্প্যানিশ ঐতিহ্যের প্রভাব স্পষ্ট। দেশটির সরকারি ভাষা স্প্যানিশ। আইন, প্রশাসন, স্থাপত্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও রয়েছে সেই ঐতিহাসিক সম্পর্কের ছাপ।

তবে বর্তমান সময়ে স্পেন ও আর্জেন্টিনার সম্পর্ক আর শাসক ও উপনিবেশের নয়। দুই দেশ এখন সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও কূটনৈতিক সম্পর্কের অংশীদার।

ইতিহাস পেরিয়ে ফুটবলের মহারণ

বিশ্বকাপ ফাইনালে এবার দুই দেশই সমান মর্যাদায় প্রতিদ্বন্দ্বী। আর্জেন্টিনা চাইছে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিততে, আর স্পেনের লক্ষ্য ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বসেরা হওয়া।

একসময় যে সম্পর্ক ছিল শাসন ও উপনিবেশের, আজ সেই দুই দেশ বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে মুখোমুখি। ইতিহাসের অধ্যায় পেছনে ফেলে এবার নতুন গল্প লিখবে ফুটবল।

মেসির আর্জেন্টিনা নাকি তরুণ শক্তিতে ভরপুর স্পেন—বিশ্বকাপ ট্রফি কার হাতে উঠবে, সেই উত্তর মিলবে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনালে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..