মাঠের খেলায় শেষ পর্যন্ত কোনো পূর্বাভাস টিকে না। কিন্তু তারপরও শক্তিমত্তার হিসাব-নিকাশ থেকে কৌশল ও পারফরম্যান্সের কিছুটা আভাস পাওয়া যায়। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আলজাজিরা এমন পাঁচটি দিক তুলে ধরেছে, যেগুলো আর্জেন্টিনা ও স্পেনের শিরোপা ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে।
পজিশনগুলোর দ্বৈরথ
স্পেনের ডান প্রান্তে লামিনে ইয়ামালের সঙ্গে অন্যতম প্রধান দ্বৈরথ হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনার নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর। চোটের কারণে আসরের শুরুতে কিছুটা ধীরগতিতে চললেও বর্তমানে ইয়ামাল চেনা ছন্দে ফিরছেন। তাঁকে সামলাতে বেগ পেতে হবে আর্জেন্টিনাকে।
মাঠের অপর প্রান্তে লিওনেল মেসিকে সামলাবেন স্প্যানিশ ডিফেন্ডার আইমেরিক লাপোর্তে ও পাউ কুবার্সি। মার্কারদের (পাহারা দেওয়া ডিফেন্ডার) চোখ ফাঁকি দিতে মেসি প্রায়ই মাঠের একটু নিচে নেমে যান। চলতি আসরেও সে প্রবণতা দেখা গেছে। ফলে লাপোর্তে ও কুবার্সির জন্য মেসিকে সামলোর কাজ বেশ কঠিন।
এছাড়া, স্পেনের হয়ে টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ৫ গোল করা মিকেল ওয়ারজাবাল মুখোমুখি হবেন আর্জেন্টিনার দুই মারকুটে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্তিনেসের।
শৈলীর লড়াই
এবারের ফাইনালে ফুটবলের দুটি বিপরীতমুখী দর্শনের মেলবন্ধন ঘটতে যাচ্ছে। পুরো আসরে মাত্র একটি গোল খাওয়া স্পেন, বলের ওপর তাদের নিরবচ্ছিন্ন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ফাইনালে উঠেছে। তারা বল নিজেদের দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে যেমন কোণঠাসা করে ফেলে, তেমনি মাঠের ওপরের দিকে বল কেড়ে নেওয়ার জন্য ‘কাউন্টার প্রেস’ ব্যবহার করে।
এই কৌশলের সফল প্রয়োগ দেখা গেছে সেমিফাইনালে। ওই ম্যাচে ফ্রান্সের কিলিয়ান এম্বাপে গোল করার তেমন কোনো সুযোগই পাননি।
বিপরীতে, আর্জেন্টিনা এই আসরে টিকে আছে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা ও সরাসরি আক্রমণের (ডিরেক্ট ফুটবল) ওপর ভর করে। আসরে অন্য যেকোনো দলের চেয়ে তারা যেমন বেশি গোল করেছে, তেমনি হজমও করেছে সাতটি।
ফাইনালে ওঠার পথে আলবিসেলেস্তেরা অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো দুটি মহাকাব্যিক ম্যাচ খেলেছে। দুইবার ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। যা দেখায়, প্রচণ্ড চাপের মুখে যেকোনো উপায়ে জয় তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে দলটি বেশ আত্মবিশ্বাসী।
মেসির জাদু
সবশেষ কয়েকটি ম্যাচে লিওনেল মেসির ভূমিকায় একটু পরিবর্তন দেখা গেছে। তিনি নিজে গোল না করে আক্রমণ তৈরি করার দিকে মনোযোগী ছিলেন। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় নিশ্চিত করা দুটি গোলেই তিনি অবদান রেখেছেন। শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে ম্যাচেও তিনি আক্রমণ শুরু করায় নেতৃত্ব দিয়েছেন।
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো- কীভাবে মেসিকে নিষ্ক্রিয় রাখা এবং খেলার মতো জায়গা (স্পেস) দেওয়া থেকে বিরত রাখা যায়?
একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, স্পেনের জমাট রক্ষণভাগ ও দ্রুত প্রেসিংয়ের কৌশলটি মেসিকে আটকানোর জন্য বেশ উপযোগী। এই কৌশলের মাধ্যমে যেসব পকেটে (মাঠের ফাঁকা জায়গা) মেসি চেনা ছন্দে খেলেন, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া যায়। ফ্রান্সের বিপক্ষে স্পেন যেভাবে খেলেছে, সেটির পুনরাবৃত্তি করতে পারলে, কোনো ক্ষতি করার আগেই মেসিকে বলের জোগান থেকে বঞ্চিত করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা হয়তো স্পেনের এই প্রেসিংকে মাঠের আরও ওপরের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করবে। এর লক্ষ্য থাকবে স্পেনের ডিফেন্সের পেছনে ফরোয়ার্ড ও উইঙ্গারদের জন্য ফাঁকা জায়গা তৈরি করা।
মাঝমাঠের লড়াই
আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের ভিত্তি গড়ে উঠতে পারে এনজো ফার্নান্দেস ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের সমন্বয়ে। সেই ভিত্তি ভেঙে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব বর্তাবে স্পেনের ব্যালন ডি’অর (২০২৪) জয়ী রদ্রির ওপর। পুরো টুর্নামেন্টে স্প্যানিশদের মাত্র একটি গোল খাওয়ার পেছনে মূল চাবিকাঠি ছিল প্রতিপক্ষের আক্রমণ নস্যাৎ করা। এক্ষেত্রে বল দ্রুত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ক্ষেত্রে রদ্রি সাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন।
আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের শেষ প্রান্তে (ফাইনাল থার্ড) বল ছাড়া মুভমেন্টের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন এনজো ফার্নান্দেস। বিশেষ করে মেসি যে ফাঁকা জায়গাগুলো (পকেট) তৈরি করে যান, তিনি সেগুলোতে ঢুকে পড়েন। অন্যদিকে ম্যাক অ্যালিস্টার গোল শট নেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি করেন। তাদের এই তৎপরতা ডি পল ও লেয়ান্দ্রো পারেদেসের রক্ষণাত্মক শক্তির সঙ্গে দারুণ এক ভারসাম্য তৈরি করে।
ফাইনালে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের এই শারীরিক শক্তি ও আগ্রাসী রূপের বিপরীতে দেখা যাবে স্পেনের রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইসের নিখুঁত টেকনিক্যাল নিয়ন্ত্রণ।
নেতৃত্ব পরিবর্তনের মুহূর্ত
এবারের ফাইনাল ম্যাচটি স্কোরলাইনের চেয়েও গভীর এক প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে। ৩৯ বছর বয়সী মেসি এবং ১৯ বছর বয়সী ইয়ামাল আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। ভাইরাল হওয়া শৈশবের একটি ছবি দুই খেলোয়াড়কে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছে।
স্পেন যদি এই ম্যাচে জয় পায়, তবে সেটি ফুটবলের নেতৃত্ব পরিবর্তনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে গণ্য হবে। যেখানে মেসির পর ফুটবল বিশ্বের পরবর্তী প্রধান তারকা হিসেবে ইয়ামালের অভিষেক ঘটবে।
তাই, দ্বিতীয়বারের মতো স্পেন ট্রফি উঁচিয়ে ধরলে, ফাইনাল ম্যাচটি কেবল ফলাফলের জন্য নয় বরং প্রজন্মের ব্যাটন হস্তান্তরের ইতিহাস হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এ জাতীয় আরো খবর..