✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-০৮, | ১৩:১৭:৫৪ |চীনে একাধিক কূটনৈতিক আয়োজনের পর এই সপ্তাহে চীনা নেতা শি জিনপিং নিজেও বিদেশ সফরে যাচ্ছেন -গন্তব্য উত্তর কোরিয়া। বহুল প্রতীক্ষিত ৮ ও ৯ই জুনের এই শীর্ষ বৈঠকটি গত মাসে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে চা-আড্ডা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একান্ত বৈঠকের পরপরই হচ্ছে।
এরপর সরাসরি পিয়ংইয়ংয়ে গিয়ে এবং এটিকে ২০২৬ সালে তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে বেছে নিয়ে শি তার অস্থির প্রতিবেশীর সঙ্গে জোটকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সিওলভিত্তিক সেজং ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফেলো ইউন-জু চোই বলেন, তাদের সম্পর্ক "কৌশলগতভাবে অপরিহার্য, কিন্তু ঘর্ষণহীন নয়"।
খুব সাজানো-গোছানো প্রকাশ্য যোগাযোগের বাইরে, এই বৈঠক বেইজিং ও পিয়ংইয়ং-উভয়ের জন্যই তাদের "রক্তে গড়া" অংশীদারিত্বে নতুন সঞ্চার আনার সুযোগ তৈরি করবে।
সম্পর্কটি বর্ণনা করতে প্রায়ই এই বাক্যাংশটি ব্যবহার করা হয়; সাম্প্রতিক সময়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও এটি ব্যবহার করেছেন, যদিও অতীত ছিল জটিল।
ভালোবাসা-ঘৃণার সম্পর্ক
শুরু থেকেই এই দুই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রভাব ও স্বাধীনতার মধ্যে একটি জটিল ভারসাম্য রক্ষা করে এসেছে-যা আরও জটিল হয়েছে পিয়ংইয়ংয়ের আরেক উত্তর প্রতিবেশী মস্কো-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে।
কোরীয় যুদ্ধের (১৯৫০-৫৩) সময় চীন উত্তর কোরিয়ার জন্য লক্ষাধিক সৈন্যের প্রাণ বিসর্জন দেয়। চীনা নেতা মাও সেতুং উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন: "ঠোঁট না থাকলে দাঁতে ঠান্ডা লাগবে।"
কিন্তু উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা নেতা কিম ইল সুং আরও শক্তিশালী সামরিক নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন এবং ১৯৬১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গড়ে তোলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি চীনের সঙ্গেও আরেকটি সামরিক চুক্তি করেন।
কিম ইল সুংয়ের 'জুচে' মতাদর্শ অনুযায়ী উত্তর কোরিয়ার লক্ষ্য ছিল আত্মনির্ভরতা গড়ে তোলা। দুই পরাশক্তির সামরিক সমর্থন পাওয়ায় দেশটি তাদের কারও উপগ্রহ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।
সে সময় পিয়ংইয়ং সাহায্য ও তেলের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
অন্যদিকে দুর্ভিক্ষের কারণে চীনের নাগরিকরা সীমান্তবর্তী তুমেন নদী পেরিয়ে উত্তর কোরিয়ায় চলে যায়। অনেকে সেখানে স্কুলেও পড়াশোনা করত, কারণ তাদের কাছে উত্তর কোরিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত মনে হতো।
কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর উত্তর কোরিয়া তার সামরিক মিত্র এবং প্রধান অর্থনৈতিক সমর্থন হারায়। এর ফলে উদীয়মান চীন পিয়ংইয়ংয়ের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
চীন এখনো উত্তর কোরিয়ার প্রধান বাণিজ্য অংশীদার-পাশের দেশের স্থিতিশীলতায় বিনিয়োগ এবং যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত দক্ষিণ কোরিয়ার একটি ভারসাম্য হিসেবে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া সেন্টারের ভিজিটিং স্কলার সিওং-হিয়ন লি বিবিসিকে বলেন, "চীন এতটুকু অর্থনৈতিক সহায়তা দেয় যাতে শাসনব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে, কিন্তু এমন বিনিয়োগ এড়িয়ে চলে যা উত্তর কোরিয়াকে পুরোপুরি স্বনির্ভর করে তুলবে।"
এর বিনিময়ে, তিনি বলেন, "চীন 'ক্যালেন্ডার শৃঙ্খলা' আশা করে-এক ধরনের অলিখিত নিয়ম, যার অর্থ গুরুত্বপূর্ণ চীনা অভ্যন্তরীণ বা কূটনৈতিক সময়সূচিতে পিয়ংইয়ং বড় ধরনের উসকানিমূলক পদক্ষেপ নেবে না।"
তবে উত্তর কোরিয়া সবসময় তা মেনে চলেনি।
পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন
চীন একটি পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত কোরীয় উপদ্বীপ চাইত—কিন্তু উত্তর কোরিয়া তবু তার পারমাণবিক লক্ষ্য অনুসরণ করেছে।
১৯৬৪ সালে ইয়ংবিয়নে পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র চালু করে কিম ইল সুং বিশ্বের ক্ষুদ্রতম পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের ভিত্তি গড়ে তোলেন।
১৯৮৫ সালে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তি (এনপিটি) স্বাক্ষর করলেও তিনি এর শর্ত ভঙ্গ করে প্লুটোনিয়াম মজুত করেন।
তবে তিনি তার দেশের কাছে কার্যকর পারমাণবিক ওয়ারহেড পৌঁছাতে দেখার আগেই মারা যান।
১৯৯৪ সালে তার ছেলে কিম জং ইল ক্ষমতায় এলে তিনি নবগঠিত কর্মসূচিকে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন—অর্থনৈতিক সহায়তা বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের সম্ভাবনার বিনিময়ে ছাড় আদায়ের চেষ্টা করেন।
২০০৩ সালে উত্তর কোরিয়া এনপিটি থেকে সরে দাঁড়ায়। তিন বছর পর তারা প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়—যার জবাবে জাতিসংঘ কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
এটি চীনের সম্মতি ছাড়া সম্ভব ছিল না। চীন এটিকে "স্পষ্টতই গুরুতর" পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করে, উপদ্বীপকে পারমাণবিকমুক্ত করার পক্ষে বক্তব্য দেয়, কিন্তু উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করতে তাদের পূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব প্রয়োগ থেকে বিরত থাকে।
চোই বলেন, "উত্তর কোরিয়ার পতন বা গুরুতর অস্থিতিশীলতা বেইজিংয়ের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে: শরণার্থী প্রবাহ, পারমাণবিক অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্র বা দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক প্রভাব উত্তরে বিস্তারের সম্ভাবনা। এসব উদ্বেগ পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বেইজিংয়ের হতাশার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।"
২০১১ সালে কিম জং উন ক্ষমতায় আসার পর তিনি দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এগিয়ে নেন, যাতে চীনের নিয়ন্ত্রণের ধারণা ভেঙে যায়।
ক্ষমতায় বসেই তিনি সংবিধানে উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক রাষ্ট্র ঘোষণা করেন এবং চীনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের সংবেদনশীল সময়েই ধারাবাহিক বিস্ফোরণ চালান।
লি বলেন, "কিম জং ইল উত্তেজক কৌশল নিলেও সাধারণত চীনের কূটনৈতিক ছন্দের প্রতি একটি শ্রেণিবদ্ধ সম্মান বজায় রাখতেন। কিন্তু কিম জং উন এর বিপরীতে সময়সূচিকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।"
২০১৩ সালের মার্চে শি প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে কিম তৃতীয় পারমাণবিক পরীক্ষা চালান। তিনি সংস্কারপন্থী কাকা জাং সং তা-েককেও মৃত্যুদণ্ড দেন, যিনি চীনের সঙ্গে দূত হিসেবে কাজ করতেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় শি জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা কঠোর করার পক্ষে দাঁড়ান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার নেতার পাশে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন যে "কোনো অবস্থাতেই" উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা মেনে নেওয়া হবে না।
সূত্র: বিবিসি বাংলা