সর্বশেষ :
জলবায়ু সঙ্কট মোকাবিলায় চলচ্চিত্রের শক্তিকে কাজে লাগানোর আহ্বান তথ্যমন্ত্রীর প্রথমবারের মতো ভ্যাকসিন তৈরি করল এআই, রোগ প্রতিরোধে নতুন আশা ইভির দিকে ঝুঁকছে ভারত, তবে বড় বাধা চার্জিং অবকাঠামো যুদ্ধের পর প্রথম রিপোর্ট: ইরানের মজুদ ইউরেনিয়ামের হদিস পাচ্ছে না আইএইএ ইরানকে তিন দিক থেকে ঘেরাও, আজারবাইজানে গোপন ঘাঁটির তথ্য ফাঁস চীনের এজেন্ট হয়ে আমেরিকায় ছদ্মনামে সাংবাদিকতা, অতঃপর… বাড়িতে চলছিল শেষকৃত্য, অতঃপর ‘অলৌকিক’ প্রত্যাবর্তন এভারেস্টে নিখোঁজ শেরপার! বিশ্বের প্রায় অর্ধেক সিগারেট পোড়ে এ দেশেই বাসচাপায় আড়াই বছরের শিশুর মৃত্যু, দুই ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধ ফুটবল বিশ্বকাপে প্রযুক্তির নতুন অধ্যায়, নিরাপত্তায় রোবট কুকুর

ইভির দিকে ঝুঁকছে ভারত, তবে বড় বাধা চার্জিং অবকাঠামো

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-০৫, | ২৩:২২:৪২ |

জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্য এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহনের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির ফলে ভারতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সূচক ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দেশটিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার এখন আর পরীক্ষামূলক পর্যায়ে নেই; বরং এটি ধীরে ধীরে মূলধারার বাজারে প্রবেশ করছে।

২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ভারতে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে দেশটির যাত্রীবাহী গাড়ির মোট বাজারে ইভির অংশীদারিত্ব ৫ শতাংশ অতিক্রম করেছে, যা সাধারণত গণহারে গ্রহণযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

ভারতের অটোমোবাইল ডিলারদের সংগঠন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিকে রূপান্তর এখন আর শুধু সম্ভাবনার বিষয় নয়, এটি বাস্তব ও দৃশ্যমান অগ্রগতির পর্যায়ে পৌঁছেছে।”

বিশেষ করে ১০ লাখ রুপির বেশি মূল্যের গাড়ির ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক মডেলের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে এই শ্রেণির প্রতি ১০টি বিক্রিত গাড়ির মধ্যে একটি বৈদ্যুতিক। এছাড়া তিন চাকার যানবাহনের ৩০ শতাংশের বেশি এবং মোটরসাইকেল বাজারের প্রায় ১৫ শতাংশ এখন বৈদ্যুতিক মডেলের দখলে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি আগ্রহ আরও বেড়েছে, যার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করছে।

ভারত তার মোট তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘ চার বছর স্থিতিশীল রাখার পর রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোকে খুচরা জ্বালানির দাম বাড়াতে হয়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাগরিকদের কারপুলিং, গণপরিবহন ব্যবহার এবং প্রয়োজন হলে বাসা থেকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে জ্বালানি সাশ্রয় করা যায়।

জাপানি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান নোমুরা বলছে, জ্বালানির উচ্চ মূল্য এবং বাজারের অনিশ্চয়তা বৈদ্যুতিক যানবাহনের পক্ষে জনমতকে আরও শক্তিশালী করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কিছু নীতিগত পরিবর্তনও ইভির চাহিদা বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘ক্যাফে-৩’ (CAFE-3) নামে পরিচিত নতুন জ্বালানি দক্ষতা ও নির্গমন মানদণ্ড, যা আগামী বছরের এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা এবং ২০৩২ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

বার্নস্টেইনের বিশ্লেষক ভেনুগোপাল গারে ও পরম শাহের মতে, নতুন এই নীতিমালা বিদ্যমান নিয়মের তুলনায় অনেক কঠোর হবে এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির গ্রহণযোগ্যতা আরও দ্রুত বাড়াবে।

প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে গাড়ি থেকে কার্বন নিঃসরণ প্রতি কিলোমিটারে ১১৩ গ্রাম থেকে কমিয়ে ৭৬ গ্রামে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা প্রায় ৩৩ শতাংশ হ্রাসের সমান।

বর্তমানে নির্গমন লক্ষ্যমাত্রা না মানার জন্য জরিমানার বিধান থাকলেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। তবে নতুন ব্যবস্থায় জরিমানা কঠোরভাবে আদায় করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা নির্মাতাদের বৈদ্যুতিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যও পৃথকভাবে ইভি ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে। বায়ুদূষণের জন্য পরিচিত রাজধানী দিল্লি সম্প্রতি একটি খসড়া নীতি প্রকাশ করেছে, যেখানে ২০২৭ সালের মধ্যে নতুন অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন (আইসিই) চালিত দুই ও তিন চাকার যানবাহনের নিবন্ধন বন্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

নোমুরার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের যাত্রীবাহী গাড়ির বাজারে বৈদ্যুতিক গাড়ির অংশীদারিত্ব ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

দুই চাকার যানবাহনের ক্ষেত্রেও তুলনামূলক সাশ্রয়ী নতুন মডেল বাজারে আসায় চাহিদা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সময়ে বৈদ্যুতিক তিন চাকার যানবাহন ২০৩০ সালের মধ্যে প্রচলিত জ্বালানিচালিত মডেলকে বিক্রির দিক থেকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ইভি রূপান্তর প্রথমে সেইসব খাতে দ্রুত এগোচ্ছে যেখানে ব্যবহারের হার বেশি এবং পরিচালন ব্যয় কমানো গুরুত্বপূর্ণ। চার্জিং অবকাঠামো বিস্তার, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং ব্যাটারির দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ গাড়ি ও মোটরসাইকেল বাজারেও প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হবে।

তবে ইতিবাচক প্রবণতা সত্ত্বেও বৈদ্যুতিক যানবাহন গ্রহণের ক্ষেত্রে ভারত এখনও বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে।

নোমুরার তথ্যানুযায়ী, চীনে যাত্রীবাহী গাড়ির বাজারে ইভির অংশীদারিত্ব ২০২০ সালের ৫ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে এ হার প্রায় ২০ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৮ শতাংশ।

চার্জিং অবকাঠামোর ঘাটতি

ভারতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো পর্যাপ্ত চার্জিং অবকাঠামোর অভাব।

গত তিন বছরে দেশটিতে সরকারি চার্জিং স্টেশনের সংখ্যা দুই হাজার থেকে বেড়ে ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। তবে এর অর্ধেকেরও বেশি মাত্র চারটি রাজ্যে কেন্দ্রীভূত, ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুবিধার বৈষম্য রয়ে গেছে।

চীনের সঙ্গে তুলনা করলে ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়। বর্তমানে চীনে প্রায় দুই কোটি পাবলিক চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে, যেখানে ভারতে সেই সংখ্যা মাত্র ১০ হাজারের কিছু বেশি।

এই পরিস্থিতির কারণে অনেক ক্রেতা এখনও ‘রেঞ্জ অ্যানজাইটি’ বা দীর্ঘ যাত্রায় ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ভোগেন, যা ইভি কেনার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা।

সরবরাহ শৃঙ্খলের ঝুঁকি

ব্যাটারি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বিরল খনিজ ও ধাতুর ক্ষেত্রে ভারত এখনও বহুলাংশে আমদানিনির্ভর।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেপিএমজির তথ্যানুযায়ী, লিথিয়াম ও কোবাল্ট পরিশোধনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এবং বিরল খনিজ পৃথকীকরণের প্রায় ৯০ শতাংশই চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ভূরাজনৈতিক নির্ভরতা ভারতের বৈদ্যুতিক যানবাহন কর্মসূচিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে এবং উৎপাদন ব্যয় প্রতিযোগিতামূলক রাখতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

সম্পূর্ণ দেশীয় খনি, ব্যাটারি এবং চুম্বক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এক দশকেরও বেশি সময় লাগতে পারে। তাই স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলার কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

নীতিগত স্পষ্টতার অপেক্ষা

ভারতের নীতি আয়োগের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অমিতাভ কান্ত মনে করেন, ইভি খাতের অগ্রগতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত ও স্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত।

তিন বছর ধরে আলোচনায় থাকলেও ক্যাফে-৩ নীতিমালার চূড়ান্ত খসড়া এখনও প্রকাশিত হয়নি। কান্তের ভাষায়, “নিয়ন্ত্রক কাঠামো সম্পর্কে স্পষ্টতা না থাকলে নির্মাতারা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেন, সরবরাহ ব্যবস্থা ধীরগতিতে এগোয় এবং পুরো শিল্পখাত অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে।”

বিশ্লেষকদের মতে, বৈদ্যুতিক যানবাহনের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি অনেকটাই নির্ভর করবে সরকারের নীতিগত ধারাবাহিকতা, চার্জিং অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর। এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হলে আগামী দশকে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বৈদ্যুতিক যানবাহন বাজারে পরিণত হতে পারে। সূত্র: বিবিসি

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..