✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-৩১, | ২২:২৬:১৪ |প্লাবিত গুহার ঘুটঘুটে অন্ধকারে টানা ১১ দিন ক্ষুধার্ত ও দুর্বল শরীরে জড়ো হয়ে বসে ছিলেন তারা। চারদিকে থই থই পানি আর তীব্র শীতের মধ্যে বাঁচার আশা যখন প্রায় শেষ, ঠিক তখনই অলৌকিকভাবে পানি কিছুটা কমতে শুরু করে। আর তা দেখেই ভেতরে আটকে থাকা চার শ্রমিক নিজেদের অবশিষ্টাংশ শক্তিটুকু এক করে মেতে ওঠেন এক অবিশ্বাস্য জীবনযুদ্ধে। কোনো উদ্ধারকারীর সাহায্য ছাড়াই, সম্পূর্ণ নিজেদের সাহসে ভর করে দীর্ঘ সুড়ঙ্গ পেরিয়ে শনিবার যখন তারা হুট করে গুহার মুখে এসে হাজির হন, তখন বাইরে অপেক্ষমাণ আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে বেঁচে ফেরা যুবকরা জানিয়েছেন, চরম মৃত্যুকালীন ভয় থেকেই মূলত এই অদম্য সাহসের জন্ম হয়েছিল।
যে অন্ধকার চেম্বারে তারা বন্দি ছিলেন, সেখান থেকে গুহার মুখ পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ২৬০ মিটার, যা একটি ৭৮ তলা ভবনের উচ্চতার সমান। এই পথটুকু মোটেও সহজ ছিল না। কোথাও ছিল বুক সমান বরফশীতল পানি, কোথাও আবার সুড়ঙ্গ এতটাই সরু ছিল যে অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। এর আগের দিন অবশ্য এই দলের প্রথম সদস্যকে আন্তর্জাতিক ডুবুরি দল অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে বাইরে নিয়ে আসে। কিন্তু বাকি চারজনকে নিরাপদ সময়ের জন্য ভেতরে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল।
লং তিয়াং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২৩ বছর বয়সী মী সিংফামালাই সেই ভয়াল অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ভেতরে আমরা চার-পাঁচজন কোনো কম্বল ছাড়াই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকতাম, যা আমাদের শরীর গরম রাখতে সাহায্য করেছিল। ভেতরে প্রচণ্ড ঠান্ডা ছিল এবং পানি যখন কিছুটা কমে আসে, তখন একা থাকার ভয়ে আমরা নিজেরাই হামাগুড়ি দিয়ে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। অনেক জায়গায় আমাদের ডুব দিতে হয়েছে, আবার কোথাও আক্ষরিক অর্থেই মানুষের শরীরের মাপের সরু সুড়ঙ্গ দিয়ে ইঞ্চি ইঞ্চি করে টেনেহিঁচড়ে এগোতে হয়েছে।
মূলত দারিদ্র্যের তাড়নাতেই দুর্গম লং তিয়াং গ্রামের কাছে একটি খনি প্রকল্পের পাহাড়ের গুহায় সোনার খোঁজে প্রথমবার ঢুকেছিলেন মী এবং তার বন্ধুরা। লাওসের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে জীবনধারণের স্থায়ী উপায় না থাকায় অনেকেই এভাবে পাহাড়ি গুহায় ভাগ্য অন্বেষণে যান। কিন্তু তারা ভেতরে ঢোকার পরপরই গ্রীষ্মকালীন ভারী বর্ষণে জঙ্গল ও গুহা প্লাবিত হয়ে যায়।
শুধু পানি খেয়ে বেঁচে থাকা মী জানান, মা ও বোনদের মুখ দেখার তীব্র আকুতিই তাকে এই নরককুণ্ডে লড়াই করার শক্তি জুগিয়েছে। বাইরে এসে যখন তিনি মানুষের উল্লাস দেখেন, তার মনে হয়েছিল তিনি এক নতুন জীবন পেয়েছেন।
ল্যাম নামের আরেক জীবনজয়ী শ্রমিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, দারিদ্র্য বড় ভয়ানক জিনিস। আর সেই কারণেই টিকে থাকার জন্য এবং বেঁচে থাকার জন্য আমরা এতটা কঠিন লড়াই করেছি।
গুহা থেকে বেরিয়ে মীর মুখে প্রথম জুটেছিল গরম জাউ ভাত। এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় তিনি কেবল নরম খাবারই খেতে পারছেন। অন্য দুই শ্রমিক কিছুটা আঘাত পেলেও ওষুধের মাধ্যমে এখন তারা সুস্থতার পথে।
এই চারজন নিজেদের চেষ্টায় অলৌকিকভাবে ফিরে এলেও খনি এলাকায় উদ্ধার অভিযান কিন্তু এখনই শেষ হচ্ছে না। কারণ, এই পাঁচজন ভেতরে ঢোকার আগেই আরও দুজন গ্রামবাসী অন্য একটি পথ দিয়ে ওই গুহাব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিলেন, যারা গত ১১ দিন ধরে নিখোঁজ। তাদের সন্ধানে পরিবারের সদস্যরা গুহার বাইরে চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছেন।
উদ্ধারকাজে নিয়োজিত অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ডুবুরি জশ রিচার্ডস জানিয়েছেন, বেঁচে ফেরা শ্রমিকদের দেওয়া মানচিত্র অনুযায়ী গুহার আরও ১০০ মিটার গভীরে একটি বড় এয়ার পকেট বা বায়ুস্তর রয়েছে। সুড়ঙ্গের সেই অংশটি অত্যন্ত সংকীর্ণ ও বিপজ্জনক। যদি নিখোঁজ দুজন বেঁচে থাকেন, তবে কেবল সেখানেই তাদের থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে গত রাতে নতুন করে বৃষ্টি হওয়ায় গুহার পানির স্তর আবারও বেড়ে গেছে, যা উদ্ধারকাজকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
আবার কখনো এই গুহায় ঢুকবেন কি না, জানতে চাইলে মী সিংফামালাই শিউরে উঠে বলেন, কখনো না। আমাকে যদি কেউ জোর করে আবার ওখানে পাঠাতে চায়, তবে তা আমাকে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতোই হবে।
সূত্র: সিএনএন