সর্বশেষ :

পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার মোদির কৌশল কীভাবে উল্টো ফল দিল

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-৩১, | ২১:৫৯:৫২ |

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৬ সালে এক জনসভায় দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন- পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হবে এবং সেই প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা হবে। কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাদের ওপর হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই দেওয়া সেই বক্তব্য ছিল ভারতের পররাষ্ট্রনীতির কঠোর অবস্থানের প্রতীক।

কিন্তু প্রায় এক দশক পর বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবতা উল্টো পথে গেছে। পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বদলে বরং চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করেছে- যা ভারতের কৌশলগত লক্ষ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

পাকিস্তানের পুনরুত্থান: চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সমীকরণ
বর্তমানে পাকিস্তান চীনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র। সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বেইজিং সফর করেন এবং দুই দেশের সম্পর্ককে ‘অটুট’ বলে উল্লেখ করেন।

একই সঙ্গে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন, যা দুই দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু কৌশলগত নয়; বরং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলন।

২০২৫ সালের যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা
২০২৫ সালের ১০ মে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয় যে, ভারত ও পাকিস্তান একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেন, দীর্ঘ আলোচনার পর এই সমঝোতা সম্ভব হয়েছে।
তবে ভারত এই মধ্যস্থতার দাবি গ্রহণ করেনি। নয়াদিল্লির অবস্থান ছিল-এটি দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফল, কোনও তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা নেই।
এই মতবিরোধ যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কেও কিছুটা উত্তেজনা সৃষ্টি করে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

‘নিরপেক্ষ কূটনীতি’ থেকে ‘কৌশলগত ঝুঁকি’ পর্যন্ত ভারত
ঐতিহ্যগতভাবে ভারত ‘নন-অ্যালাইন্ড’ বা জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতো। কিন্তু মোদি সরকারের সময় থেকে সেই অবস্থান ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়।
বিশেষ করে ২০১৬ সালের পর ভারতের নীতি হয়ে ওঠে-
•    সন্ত্রাস ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না
•    সীমান্ত পেরিয়ে সামরিক প্রতিক্রিয়া 
•    কূটনৈতিকভাবে পাকিস্তানকে চাপ দেওয়া 
২০১৬ ও ২০১৯ সালে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ভারতীয় সামরিক অভিযান এই কৌশলেরই অংশ ছিল।
কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই কঠোর অবস্থান পাকিস্তানকে দুর্বল করার বদলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সহানুভূতি ও কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

কাশ্মীর ইস্যু: অমীমাংসিত কেন্দ্রীয় সংকট
কাশ্মীর প্রশ্নই দুই দেশের সম্পর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু। অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম সামরিকীকৃত এলাকা হিসেবে পরিচিত, যেখানে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে।

২০১৯ সালে ভারতীয় সরকার কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করে অঞ্চলটিকে কেন্দ্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে আনে। এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিতর্ক তৈরি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, কাশ্মীর ইস্যু সমাধান না হলে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক স্থায়ী স্থিতিশীলতায় পৌঁছানো কঠিন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের কূটনৈতিক পুনর্গঠন
পাকিস্তান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কূটনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনে সফল হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
•    চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি 
•    উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব 
•    যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খনিজ ও প্রযুক্তি খাতে চুক্তি 
এছাড়া সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিও করেছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেও পরিবর্তনের ছায়া
গত দুই দশক ধরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে চীনের ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই সম্পর্কেও কিছু টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে।
কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
•    বাণিজ্য শুল্ক ও অর্থনৈতিক বিরোধ 
•    রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি 
•    মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে পার্থক্য 
•    যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তানমুখী কূটনৈতিক আগ্রহ বৃদ্ধি 
তবে উভয় দেশই এখনও কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন ভারসাম্য
দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে ২০১৬ সালের পর থেকে। ভারত পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে সংগঠনটি বর্জন করলে এর কার্যক্রম স্থবির হয়ে যায়। এর বিপরীতে ভারত বিমসটেকের মতো বিকল্প আঞ্চলিক জোটকে গুরুত্ব দিচ্ছে, যেখানে পাকিস্তান নেই।
অন্যদিকে পাকিস্তান চীন, তুরস্ক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে।

ইসলামোফোবিয়া ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব ফেলেছে বলে সমালোচকদের দাবি। বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ধর্মীয় উত্তেজনা এবং বিতর্কিত মন্তব্য আন্তর্জাতিকভাবে ভারতের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলেছে। পাকিস্তান এই বিষয়গুলোকে কূটনৈতিক আলোচনায় ব্যবহার করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

বিশ্লেষকদের মত: কৌশলগত পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক এখন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
একজন বিশ্লেষকের ভাষায়, পাকিস্তান এখন শুধু প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র নয়; বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
অন্যদিকে ভারতকে এখন চীন-যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান ত্রিমুখী কূটনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: সংঘাত নাকি সংলাপ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ তিনটি পথে যেতে পারে-
১. সীমিত সংঘাত ও কূটনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকা 
২. গোপন বা আংশিক সংলাপের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সমঝোতা 
৩. বড় কোনও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সৃষ্টি 
তবে তারা সতর্ক করে বলছেন- কাশ্মীর ইস্যু সমাধান ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।

মোদির পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার কৌশল এক সময় কার্যকর মনে হলেও, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তা উল্টো ফল দিয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষকের মত। পাকিস্তান এখন একাধিক শক্তিশালী বৈশ্বিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, আর ভারতকে নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ তাই এখনও অনিশ্চিত- যেখানে যুদ্ধবিরতি আছে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি এখনও অধরা। সূত্র: আল-জাজিরা

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..