উত্তরের চরাঞ্চলে নেই ঈদের আনন্দ, হয়নি পশু কোরবানি

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-২৮, | ১৮:৩৯:৩০ |

উত্তরের নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে এবার ঈদুল আজহা এসেছে নিঃশব্দ বেদনা হয়ে। তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র দুধকুমার নদীর বুকে ছড়িয়ে থাকা শতশত চরে নেই উৎসবের রঙ, নেই কোরবানির আনন্দ। কোথাও ঈদের দিনেও হাঁড়িতে ওঠেনি মাংস, কোথাও আবার নদীভাঙনের আতঙ্কে মানুষ রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে বসতভিটা।

রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধায় প্রায় ৭০০টি চর রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চর কুড়িগ্রামে, প্রায় ৪৫০টি। প্রতিটি চরে বসবাস করে ১৫০ থেকে ৫০০ পরিবার। এসব চরবাসীর প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ। কিন্তু এবার আলু, ধান, ভুট্টাসহ প্রায় সব ফসলেই লোকসানের কারণে ঈদের আনন্দ যেন হারিয়ে গেছে। অধিকাংশ চরেই হয়নি পশু কোরবানি।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধান এলাকার কৃষক মকবুল হোসেনের বয়স এখন ৬৮। জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে মাঠে-ঘাটে। কিন্তু এবারের ঈদ তার কাছে উৎসব নয়, বরং দীর্ঘশ্বাসের আরেকটি দিন। উঠানে ধান শুকালেও ঘরে নেই ঈদের আনন্দ, শিশুদের নতুন জামার হাসিও নেই।

১১ বিঘা জমিতে আলুচাষ করে তিন লাখ টাকার বেশি লোকসান গুনেছেন তিনি। এখনো আড়াই লাখ টাকার ঋণ মাথায়। ভেবেছিলেন বোরো ধান হয়তো কিছুটা স্বস্তি দেবে। কিন্তু ভালো ফলন হলেও বাজারদর তাকে আরও হতাশ করেছে।

মকবুল হোসেন বলেন, “প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়েছে প্রায় ৯৫০ টাকা। অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। ধান, আলু, ভুট্টা—সবখানেই লোকসান। কয়েক দফা কালবৈশাখীতে সবজিও নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষিকাজে এবার শুধু ক্ষতি আর ক্ষতি। মনে কোনো শান্তি নেই। ঈদের আনন্দও নেই।”

লালমনিরহাট সদর উপজেলার ধরলা নদীর বুকে দ্বীপচর ফলিমারীতে প্রায় ৩০০ পরিবারের বসবাস। গেল কয়েকদিন ধরে নদীভাঙন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো চরে। ঈদের দিনেও নদীর তীরে চলেছে ভাঙন। ফলে উৎসবের বদলে উৎকণ্ঠাই এখন সঙ্গী। গেল বছর এই চরে দুটি গরু ও তিনটি ছাগল কোরবানি হলেও এবার কোনো পশু কোরবানি হয়নি।

চরের বাসিন্দা সাহেদা বেওয়া  বলেন, “এক সপ্তাহ আগে নদী আমাদের তিন বিঘা জমি আর বসতভিটা গিলে নিয়েছে। বাকি জমিও ভাঙনের মুখে। ঈদের দিনেও ভাঙন চলছে। এমন অবস্থায় ঈদের আনন্দ কই? মাংস তো দূরের কথা, ডাল-সবজি দিয়ে ভাত খেতে হয়েছে। তিনি জানান, সরকার থেকে ১০ কেজি চাল পেয়েছেন। সেটাই এখন তাদের বড় ভরসা।

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তা নদীর বুকে চর টেপামধুপুরের কৃষক আলী (৬৫)। ঈদের সকালেও ছিলেন বিষন্ন। ঈদগাহে নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরে আরও বেশি কষ্ট পেয়েছেন তিনি। সাত সদস্যের পরিবারের কাউকেই এবার নতুন পোশাক কিনে দিতে পারেননি। গেল বছর গরু কোরবানিতে অংশ নিয়েছিলেন। এবার বাজার থেকে মাংস কেনার সামর্থ্যও নেই।

তিনি বলেন, “আলুতে সর্বনাশ হয়েছে। ধানও বাঁচাতে পারল না। উৎপাদন খরচই উঠছে না। ভুট্টার দাম কম, তামাকের দাম কম—সব মিলিয়ে আমরা শেষ হয়ে গেছি। ২৫ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করা এই কৃষকের মাথায় এখন তিন লাখ টাকার ঋণ। প্রতিদিন বাড়ছে ঋণদাতাদের চাপ।

তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, “এবার ফসল ফলাতে খরচ বেশি হয়েছে, কিন্তু দাম কমে গেছে। উৎপাদন খরচও উঠছে না। আমাদের পরিবারে এবার ঈদ নেই।”

কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, এবছর অধিকাংশ চরেই পশু কোরবানি হয়নি। গত বছর অনেক চরে কোরবানি হলেও এবার কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় মানুষ চরম হতাশার মধ্যে রয়েছে।

তিনি বলেন, “চরের মানুষ পুরোপুরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এবার উৎপাদিত ফসলের দাম এত কম যে তারা লোকসানে পড়েছে। তাই অধিকাংশ পরিবারে ঈদের আনন্দ নেই।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর অঞ্চলে প্রায় ১২ লাখ কৃষি পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে চার লাখ পরিবার চরাঞ্চলে বসবাস করে। ধান, আলু ও ভুট্টা এসব এলাকার প্রধান ফসল।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “এবার উৎপাদন ভালো হলেও বাজারদর কম। উৎপাদন খরচও বেড়েছে। ফলে কৃষকরা হতাশ। এর প্রভাব পড়েছে ঈদ উদযাপনেও। কৃষক যদি বারবার লোকসানে পড়ে, তাহলে তারা কৃষিকাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।”

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..