✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-২৭, | ১৩:৩১:৩২ |কোভিড-১৯ মহামারীর পর দীর্ঘ সংকট কাটিয়ে বিশ্ব পর্যটন খাত যখন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, তখন ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫ সালের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের তুলনায় দেশটিতে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু পর্যটন খাতের সংকট নয়, বরং বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি কমে যাওয়ারও বড় ইঙ্গিত।
বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রায় ৪০ লাখ কম বিদেশি পর্যটক যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। এর ফলে দেশটির অর্থনীতিতে ৮০০ কোটিরও বেশি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। মহামারি বাদ দিলে গত দুই দশকের মধ্যে এটিই আন্তর্জাতিক পর্যটনে সবচেয়ে বড় বার্ষিক পতন।
বিশ্লেষকদের দাবি, এবারের সংকটের পেছনে কোনো মহামারি বা অর্থনৈতিক মন্দা নয়, বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কূটনৈতিক উত্তেজনাই বড় ভূমিকা রেখেছে। বিদেশি পর্যটকদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের কড়া অভিবাসন নীতি, শুল্ক যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে আক্রমণাত্মক অবস্থান এবং বৈশ্বিক ইস্যুতে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে দেশটি এড়িয়ে চলছেন।
জার্মানি, ভারত, ফ্রান্স, চিলি, অস্ট্রেলিয়া এবং চীন থেকে আসা দর্শনার্থীদের সংখ্যায় লক্ষণীয় হ্রাস ঘটলেও, যুক্তরাষ্ট্রে পর্যটক কমার সিংহভাগ কারণ ছিল প্রতিবেশী কানাডিয়দের সীমান্ত পার না হওয়া।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে পর্যটক কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল কানাডা। কানাডিয় পর্যটকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ নিয়ে অনীহা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। অনেক কানাডীয় নাগরিক জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্য ও নীতির কারণে তারা নিজেদের অসম্মানিত মনে করছেন। ফলে নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা বা ক্যালিফোর্নিয়ার বদলে তারা জাপান, ইতালি ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করছেন।
টরন্টোর বাসিন্দা রে সিজার বলেন, “পৃথিবীতে ঘোরার মতো অসংখ্য সুন্দর জায়গা আছে। এখন আর যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সেই তালিকায় নেই।” তিনি জানান, সম্প্রতি তিনি ও তার স্ত্রী নিউইয়র্ক সফর বাতিল করে জাপানে গেছেন এবং ভবিষ্যতেও ইউরোপ ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন।
একই ধরনের প্রতিক্রিয়া এসেছে ইউরোপ থেকেও। সুইডেন ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিক ক্যারিন উইলিয়ামস জানান, তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য যুক্তরাষ্ট্র সফরের পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিদেশিদের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়।
পর্যটন বিশ্লেষক অ্যাডাম স্যাকস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতিগুলো স্বল্পমেয়াদে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। তার মতে, “একসময় ভ্রমণ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী বাণিজ্য ভারসাম্য ছিল। কিন্তু এখন আমেরিকানরাই বিদেশে বেশি অর্থ ব্যয় করছেন, আর বিদেশিরা যুক্তরাষ্ট্র এড়িয়ে যাচ্ছেন।”
তিনি আরও বলেন, ভিসা জটিলতা, অতিরিক্ত ভ্রমণ ব্যয়, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আকাশপথেও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রগামী পর্যটনে।
এদিকে পর্যটক কমে যাওয়ার বড় প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ওপরও। সিয়াটল, ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়ার বহু পর্যটননির্ভর প্রতিষ্ঠান বুকিং কমে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক কোম্পানিকে কর্মী ছাঁটাই করতেও বাধ্য হতে হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার পর্যটন ব্যবসায়ী অ্যাডাম ডুফোর্ড জানান, গত এক বছরে তার ব্যবসার আয় অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে। তিনি বলেন, “পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে আমাকে কয়েকজন কর্মী ছাঁটাই করতে হয়েছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যটন শুধু অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি একটি দেশের “সফট পাওয়ার” বা বৈশ্বিক প্রভাবেরও বড় অংশ। বিদেশিরা কোনো দেশে ভ্রমণ করলে সেই দেশের সংস্কৃতি, সমাজ ও মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু পর্যটক কমে গেলে বিশ্বে সেই দেশের ইতিবাচক প্রভাবও দুর্বল হয়ে পড়ে।
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের বিশ্লেষক জুলিয়েট কাইয়েম বলেন, “একসময় যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দেশ ছিল, যাকে বিশ্ব অনুসরণ করতে চাইত। এখন সেই ভাবমূর্তি অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
তবে বিশ্লেষকদের আশা, সামনে বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিছুটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে প্রায় ১০ লাখ বিদেশি পর্যটক দেশটিতে আসতে পারেন। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত বড় ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য এটি যথেষ্ট নয়।
আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আস্থা ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও ইতিবাচক কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে, কঠোর নীতি শিথিল করতে হবে এবং বিশ্বে নিজের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সূত্র : সিএনএন