তাজমহলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ছবি নিয়ে ইরানের খোঁচা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-২৬, | ১৭:৩৪:৪৭ |

ভারতে সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং তার স্ত্রী জিনেট রুবিও আগ্রার ঐতিহাসিক তাজমহল পরিদর্শন করে ডায়ানা বেঞ্চে বসে একটি ছবি তোলেন। ইউনেস্কো স্বীকৃত এই বিশ্ব ঐতিহ্যের সামনে তোলা নিখুঁত সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করতেই শুরু হয়েছে তুমুল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনা। চলমান আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের আবহে এই ছবিকে হাতিয়ার করে ওয়াশিংটনকে তীব্র কটাক্ষ করেছে তেহরান।

হায়দ্রাবাদে অবস্থিত ইরানের কনস্যুলেট জেনারেল এই সফরের তীব্র সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী যদি তাজমহলের ইতিহাস কিংবা এর স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে সামান্যতমও জানতেন, তবে তিনি কখনই এই সৌধের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার সাহস দেখাতেন না। ইরানি দূতাবাসের পক্ষ থেকে আরও মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে, তাজমহল নির্মিত হয়েছিল মুঘল সম্রাটের এক ইরানি বংশোদ্ভূত স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে এবং এটি তৈরি করেছিলেন পারস্যের প্রতিভাবান স্থপতিরা। অথচ সেই স্মৃতিস্তম্ভে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন এমন এক দেশের প্রতিনিধি, যার সরকার আজ ইরানি সভ্যতাকে ধ্বংস করার হুমকি দিচ্ছে এবং অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতাকে প্রতিনিয়ত অপমান করে চলেছে।

এই কূটনৈতিক বাদানুবাদ মূলত সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি পুরোনো হুঁশিয়ারিকে মনে করিয়ে দেয়, যখন তিনি ইরান সংঘাতের চরম মুহূর্তে দেশটির প্রাচীন সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। সে সময় ইরানের সামরিক কমান্ডাররা মার্কিন প্রশাসনের এই হুমকির পাল্টা জবাব দিয়ে বলেছিলেন, আড়াইশ বছরের সামান্য ইতিহাস নিয়ে চলা একটি রাষ্ট্র কীভাবে ছয় হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো একটি প্রাচীন সভ্যতাকে মুছে ফেলার কথা ভাবে। মার্কো রুবিওর তাজমহল সফরের পর সেই পুরোনো ক্ষোভ আবার নতুন করে উস্কে দিল ইরান।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৬৩২ সালে মুঘল সম্রাট শাহজাহান তার প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই অনন্য সৌধ নির্মাণ করেন। মমতাজ মহল, যাঁর আসল নাম ছিল অর্জুমান্দ বানু বেগম, তিনি ছিলেন পারস্যের এক অত্যন্ত প্রভাবশালী অভিজাত পরিবারের সন্তান। তার দাদা মির্জা গিয়াস বেগ ১৫৭৭ সালে তেহরান থেকে ভারতে এসে মুঘল সম্রাট আকবরের দরবারে যোগ দেন। মমতাজ মহলের মা দিওয়ানজি বেগমও ছিলেন ইরানের কাজভিন শহরের এক নামী পারসিক আমলার কন্যা। ফলে তাজমহল যার স্মরণে তৈরি, তাঁর রক্তে ও ঐতিহ্যে মিশে ছিল খাঁটি পারস্যের ছোঁয়া।

স্থাপত্যকলার দিক থেকেও আধুনিক ইরানের বাইরে তাজমহলকে পারসিক স্থাপত্যের সবচেয়ে বড় ও শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়। এর বিশালাকার গম্বুজ, নিখুঁত জ্যামিতিক সামঞ্জস্য এবং শ্বেতপাথরের গায়ে পিয়েত্রা দুরা বা রত্নখচিত নকশার কাজ সরাসরি পারস্যের সাফাভিদ শৈলী থেকে অনুপ্রাণিত। এমনকি তাজমহলের সামনে থাকা সুবিশাল চারবাগ বা চার কোণের বাগান পদ্ধতিও পারসিক উদ্যান সংস্কৃতির অংশ, যা স্বর্গীয় নদীর প্রতীক হিসেবে তৈরি। 

এছাড়া এই সৌধের দেয়ালে খোদাই করা পবিত্র কোরআনের ক্যালিগ্রাফি করেছিলেন ইরানের শিরাজ শহর থেকে আসা বিখ্যাত লিপিশিল্পী আবদুল হক, যাঁকে পরবর্তীতে আমানত খান উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ভারতীয় ও পারসিক শিল্পরীতির এই অভূতপূর্ব মেলবন্ধনের ইতিহাস না জেনেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেখানে ছবি তুলেছেন বলে দাবি ইরানের।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..