মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শুরুর পর থেকেই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনায় রয়েছে ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’।
ফেব্রুয়ারির শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় এ নৌপথ কার্যত অবরুদ্ধ রেখেছে ইরান। সম্প্রতি প্রণালিটি চালু করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সামুদ্রিক ঠিকাদার কোম্পানি। এজন্য সমুদ্রে পাতা মাইন বা বিস্ফোরক শনাক্ত ও অপসারণে নতুন ধরনের চালকবিহীন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে এসব পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে আবারো আলোচনায় এসেছে আধুনিক নৌ ড্রোন প্রযুক্তি। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, পরিস্থিতি অনুকূলে এলে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বহুজাতিক উদ্যোগে অংশ নেবে দেশটি। এ কাজে ব্যবহার করা হবে কানাডার প্রতিষ্ঠান ক্রাকেন রোবোটিকসের তৈরি স্বয়ংক্রিয় মাইন শনাক্তকারী জাহাজ।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান খুব বেশি মাইন স্থাপন করেনি। তবে নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, মাইন থাকার এ অনিশ্চয়তাই জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার জন্য যথেষ্ট।
যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির সাবেক রিয়ার অ্যাডমিরাল জন পেনট্রেথ বলেন, ‘মাইন আছে কি নেই, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা কঠিন। ফলে থাকার আশঙ্কাই জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে।’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার মাইনগুলো পানির উপরিভাগে ভেসে থাকত এবং কোনো জাহাজের স্পর্শে এলে বিস্ফোরিত হতো। কিন্তু আধুনিক মাইনগুলো সাধারণত সমুদ্রের তলদেশে বসানো থাকে। এগুলোয় বিশেষ সেন্সর থাকায় ওপর দিয়ে জাহাজ যাওয়ার সময় তা শনাক্ত করে বিস্ফোরণ ঘটায়।
জন পেনট্রেথ জানান, আধুনিক মাইনগুলো খুঁজে বের করতে ও ধ্বংস করতে বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনী এখন চালকবিহীন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে। এতে পানির ওপর চলা ছোট জাহাজ, সোনার (সাউন্ড নেভিগেশন অ্যান্ড রেঞ্জিং) প্রযুক্তি ও পানির নিচে চলা ড্রোন একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়।
ইউক্রেনীয়-যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্টার্ট আপ প্রতিষ্ঠান ইউফোর্সের প্রধান নির্বাহী ওলেগ রোগিনস্কি জানান, ড্রোন থেকে এখন আরেকটি ড্রোন পরিচালনা করা যায়। এমনকি লন্ডনে বসেও পুরো কাজ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। "
প্রতিষ্ঠানটির তৈরি ‘মাগুরা’ নামের সামুদ্রিক ড্রোন এরই মধ্যে কৃষ্ণসাগরে রুশ জাহাজে হামলায় ব্যবহার হয়েছে। তবে একই প্রযুক্তি দিয়ে মাইন শনাক্তের কাজও করা যায় বলে দাবি রোগিনস্কির।
খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সমুদ্রের সব মাইন পুরোপুরি নির্মূল করা এ অভিযানের লক্ষ্য নয়। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নিরাপদ পথ তৈরি করা এর মূল উদ্দেশ্য।
যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নজরদারি প্রতিষ্ঠান এসআরটি ম্যারিনের প্রধান নির্বাহী সাইমন টাকার জানান, এসআরটি ম্যারিন বর্তমানে কুয়েতের জলসীমা পাহারা ও নজরদারির জন্য সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থা সরবরাহ করছে। এর মধ্যে ওশেন ইনফিনিটি নামের প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা চালকবিহীন সারফেস ভেসেল বা নৌযানও রয়েছে। টাকার বলেন, তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য সরকারের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছেন ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স এরই মধ্যে চালকবিহীন মাইন অপসারণ প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ করেছে। এসব ব্যবস্থায় পানির ওপর চলা ড্রোন, সোনার যন্ত্র ও পানির নিচে চলা ছোট যান একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়।
এদিকে ব্রিটিশ ও ফরাসি নৌবাহিনী গত বছর থেকে থ্যালসের তৈরি নতুন চালকবিহীন ম্যারিন মাইন কাউন্টার মেজার্স সিস্টেম ব্যবহার শুরু করেছে। এ সিস্টেমে একটি ড্রোন বোট, টেনে নেয়ার মতো সোনার অ্যারে এবং হান্টার সাবমার্সিবল থাকে।
প্রযুক্তির এত উন্নতির পরও মাইন পরিষ্কারের কাজটি এখনো বেশ কঠিন ও জটিল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও সিন্থেটিক অ্যাপারচার সোনার ব্যবহারের ফলে সমুদ্রের তলদেশের আবর্জনা থেকে মাইনকে আলাদা করা এখন সহজ হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাইড্রোগ্রাফিক বিশেষজ্ঞরা জানান, এ পদ্ধতিতে তিন থেকে চার সেন্টিমিটার রেজল্যুশনের ছবি পাওয়া সম্ভব। তবে সমস্যা হলো সমুদ্রের তলদেশে এমন অনেক নলাকার বা সিলিন্ডার আকৃতির বস্তু থাকে, যা দেখতে মাইনের মতোই লাগে।
উক্ত বিশেষজ্ঞ আরো জানান, হরমুজ প্রণালিতে মাইন খোঁজার কাজটি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ঝুঁকির কারণেই কঠিন নয়, এর ভৌগোলিক কিছু কারণও রয়েছে। সংকীর্ণ সমুদ্রপথের পানি তুলনামূলক অগভীর। ফলে ভারী সামুদ্রিক জাহাজ চলাচলের কারণে সমুদ্রের তলদেশের বালি ও কাদা ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করে। অনেক সময় মাইনগুলো সহজেই বালি বা কাদার নিচে ঢাকা পড়ে যায়।
চালকবিহীন প্রযুক্তি ব্যবহার হলেও পুরো কাজ ঝুঁকিমুক্ত নয়। কারণ বড় এলাকা পরিষ্কার করতে সহায়তাকারী জাহাজগুলোকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যেই অবস্থান করতে হতে পারে।
এ জাতীয় আরো খবর..