✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-২০, | ১৪:২০:৪৩ |আসন্ন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ফুটবল দুনিয়ায় উন্মাদনার পারদ এখন তুঙ্গে। এরই মধ্যে ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী মারাকানার শহর রিও ডি জেনিরোতে কোচ কার্লো আনচেলত্তি ঘোষণা করেছেন তাঁর বহুল প্রতিক্ষিত ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দল। ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের মিশনকে সামনে রেখে ঘোষিত এই সেলেসাও স্কোয়াডে যেমন রয়েছে অভিজ্ঞতার দারুণ মিশেল, তেমনি রয়েছে তরুণ তুর্কিদের জয়জয়কার। তবে কেবল মাঠের নৈপুণ্যই নয় এই ২৬ জন ফুটবলারের ব্যক্তিগত জীবন এবং ফুটবলীয় ক্যারিয়ারের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে নানা রোমাঞ্চকর এবং অবিশ্বাস্য গল্প।
ব্রাজিল দলের গোলপোস্ট সামলানোর দায়িত্বে থাকা অ্যালিসন বেকারের ক্ষেত্রে বলা যায়, গোলকিপিং যেন তাঁদের পারিবারিক ঐতিহ্য। লিভারপুলের এই এক নম্বর তারকার বাবা অপেশাদার ফুটবলার হিসেবে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়েছেন, আর তাঁর বড় ভাই মুরিয়েলও ব্রাজিলের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি ক্লাবে সুনামের সাথে গোল সামলেছেন। অন্যদিকে ম্যানচেস্টার সিটির পাঠ চুকিয়ে ফেনেরবাচেতে যোগ দেওয়া এদেরসন প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে গোলরক্ষক হিসেবে সর্বোচ্চ ৭টি অ্যাসিস্ট করার এক অনন্য রেকর্ড নিজের ঝুলিতে পুরেছেন। এছাড়া আরেক গোলরক্ষক ওয়েভারতন তো পালমেইরাসে যোগ দেওয়ার আগে সান্তোসের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী করিন্থিয়ান্সের যুব দলে নজর কেড়েছিলেন।
সেলেসাওদের রক্ষণভাগও এবার গড়া হয়েছে রেকর্ড আর ঐতিহ্যের মিশেলে। অভিজ্ঞ লেফট-ব্যাক অ্যালেক্স সান্দ্রো জুভেন্টাসের হয়ে ৩২৭টি ম্যাচ খেলে ক্লাবটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা বিদেশি খেলোয়াড় হিসেবে চেক কিংবদন্তি পাভেল নেদভেদের রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন। রক্ষণভাগের আরেক স্তম্ভ ব্রেমারের নাম রাখা হয়েছিল ১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানিকে জেতানো গোলদাতা আন্দ্রেয়াস ব্রেহমের নামানুসারে। অন্যদিকে আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েস ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে গানার্সদের ইতিহাসে ডিফেন্ডার হিসেবে সর্বোচ্চ ২৫টি গোলে অবদান রেখে নতুন ইতিহাস গড়েছেন। রক্ষণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা মার্কিনিয়োস পিএসজির হয়ে এবার রেকর্ড ১১তম লিগ শিরোপা জিতে ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এবারের দলে বেশ কয়েকজন এমন খেলোয়াড় আছেন যাঁদের পজিশন বদল বা ঘরোয়া ফুটবলে ভিন্ন অভিজ্ঞতার গল্প বেশ চমকপ্রদ। রক্ষণভাগের রজার ইবানেজ ক্যারিয়ারের শুরুতে সেন্ট্রাল ও ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেললেও এখন সেন্টার-ব্যাক এবং রাইট-ব্যাক হিসেবে সমান পারদর্শী। আবার রোমার হয়ে মূলত লেফট উইঙ্গার হিসেবে খেলা ওয়েসলিকে এবার আনচেলত্তি রাইট-ব্যাকের গুরুদায়িত্ব দিতে পারেন। অন্যদিকে পোড়খাওয়া ডিফেন্ডার লিও পেরেইরা ২০১৭ সালে অরল্যান্ডো সিটিতে খেলার সময় কিংবদন্তি কাকার সান্নিধ্যে এসে ফুটবলীয় দীক্ষা নিয়েছিলেন।
মাঝমাঠের লড়াইয়ে ব্রাজিলের বড় শক্তি ব্রুনো গিমারায়েস, যিনি তাঁর বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিউক্যাসল ইউনাইটেডে ৩৯ নম্বর জার্সি পরে খেলেন, কারণ তাঁর বাবা ৩৯ নম্বর ট্যাক্সি চালাতেন। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী ক্যাসেমিরো এখন মার্সেলোর সাথে যৌথভাবে ইউরোপের সফলতম ব্রাজিলিয়ান। দলে আছেন আরেক দানিলু সান্তোস, যিনি শৈশবে এক টুর্নামেন্টে বেশি বয়সের কোটায় গোলকিপার হিসেবে খেলে পেনাল্টি ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন। ফ্ল্যামেঙ্গোর বর্তমান কোচ লিওনার্দো জার্দিমের অধীনে মোনাকোয় থাকার সময় রাইট-ব্যাক থেকে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বনে যাওয়া ফাবিনহো যেমন দলে আছেন, তেমনি আছেন লুকাস পাকেতা, যাকে ওয়েস্ট হ্যাম থেকে রেকর্ড ৪২ মিলিয়ন ইউরোতে দলে ভিড়িয়েছে ফ্ল্যামেঙ্গো।
আক্রমণভাগে তারুণ্যের নতুন জোয়ার এনেছেন এন্ড্রিক, যিনি অলিম্পিক লিওঁর হয়ে সর্বকনিষ্ঠ বিদেশি খেলোয়াড় হিসেবে হ্যাটট্রিক করার কীর্তি গড়েছেন। তাঁর সাথে আছেন গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি, যিনি মাত্র ১৬ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবলে অভিষিক্ত হয়ে নতুন শতাব্দীতে ইতুয়ানোর সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হওয়ার রেকর্ড গড়েছিলেন। এছাড়া ব্রেন্টফোর্ডের তারকা স্ট্রাইকার ইগর থিয়াগো চলতি মরসুমে প্রিমিয়ার লিগে ২২টি গোল করে যেকোনো ব্রাজিলিয়ানের পক্ষে এক মরসুমে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটি নিজের করে নিয়েছেন।
দলের অন্য ফরোয়ার্ডদের গল্পগুলোও বেশ বৈচিত্র্যময়। যেমন লুইজ হেনরিক ফুটবলার হওয়ার আগে কৈশোরে জুডো খেলতেন এবং ম্যাট ছেড়ে সবুজ ঘাসে পা রেখে আজ সফল। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মাথেউস কুনহা দেশের মাটিতে কখনো পেশাদার ফুটবল না খেললেও ২০২০ টোকিও অলিম্পিকের ফাইনালে গোল করে ব্রাজিলকে সোনা জিতিয়েছিলেন। বার্সেলোনা তারকা রাফিনহার বাবা এক সাম্বা ব্যান্ডের সদস্য ছিলেন, যার সুবাদে কিংবদন্তি রোনালদিনহোর পারিবারিক অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার মাধ্যমে রাফিনহার সাথে এই মহানায়কের দারুণ সখ্যতা গড়ে ওঠে। তরুণ রায়ান আবার ব্রাজিলের সাবেক ডিফেন্ডার ভালকমারের ছেলে, যিনি ১৯৯৩ সালের অনূর্ধ্ব-১৭ টুর্নামেন্টে কিংবদন্তি রোনালদোর সাথে একই ড্রেসিংরুম শেয়ার করেছিলেন।
তবে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মূল চোখ থাকবে নেইমার এবং ভিনিসিয়াস জুনিয়রের ওপর। সান্তোসের জাদুকর নেইমার যদি এবার ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সি গায়ে মাঠে নামেন, তবে তিনি মহাতারকা পেলের পর দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান হিসেবে টানা চারটি বিশ্বকাপে ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সি পরার অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করবেন। অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ১০৫ গোলের কোটা পার করে 'ফেনোমেনন' রোনালদোকে ছাড়িয়ে যাওয়া ভিনিসিয়াস জুনিয়র এখন লস ব্লাঙ্কোসদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ব্রাজিলিয়ান। সব মিলিয়ে আনচেলত্তির এই ছাব্বিশের বহর হেক্সা মিশন সফল করতে উত্তর আমেরিকার মাঠে নিজেদের উজাড় করে দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।