✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-১৩, | ২২:২৩:০৮ |২০১৮ সালে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে যখন সিনেমা হল চালু করা হয়েছিল, তখন সৌদি আরবের লক্ষ্য ছিল কেবল তেলের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে একটি বিনোদন সাম্রাজ্য গড়ে তোলা। কাড়ি কাড়ি অর্থ ঢেলে হলিউডের বড় স্টুডিওগুলোকে আকৃষ্ট করা এবং নিজস্ব চলচ্চিত্রশিল্পকে বিশ্বমানে নিয়ে যাওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল দেশটির। কিন্তু আট বছর পর এসে দেখা যাচ্ছে, সেই প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান রয়ে গেছে। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এবং দর্শকদের চাহিদাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পারায় সৌদির চলচ্চিত্র স্বপ্ন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
সম্প্রতি ১৫০ মিলিয়ন ডলার বাজেটের বিশাল চলচ্চিত্র ‘ডেজার্ট ওয়ারিয়র’ বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ায় আন্তর্জাতিকভাবে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে দেশটি। অ্যান্থনি ম্যাকি অভিনীত এই ছবিটি ছিল বিশ্ব মানচিত্রে সৌদি চলচ্চিত্রের বড় জয়গান গাওয়ার হাতিয়ার, কিন্তু মুক্তির দুই সপ্তাহে এটি আমেরিকা ও আরব বিশ্ব মিলিয়ে মাত্র ৭ লাখ ডলার আয় করতে সক্ষম হয়েছে। এই ব্যর্থতাকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে যখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা পুরো পরিবেশকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। কান চলচ্চিত্র উৎসবেও এ বছর সৌদি আরবের কোনো ছবি জায়গা পায়নি, যা গত দুই বছরের তুলনায় তাদের পিছিয়ে যাওয়ারই ইঙ্গিত দেয়।
তবে এই সংকটের মধ্যেও হলিউডে সৌদি আরবের বিনিয়োগ কিন্তু থেমে নেই। সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ক কিছুটা স্তিমিত হওয়ার পর রিয়াদ আবারও হলিউডের ব্যবসায় বড় অংশীদার হতে শুরু করেছে। সম্প্রতি ভিডিও গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইলেকট্রনিক আর্টসকে ৫৫ বিলিয়ন ডলারে অধিগ্রহণ করেছে সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড বা পিআইএফ। এর পাশাপাশি প্যারামাউন্ট এবং ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির মধ্যকার বিশাল একীভূতকরণ চুক্তিতেও প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে বড় অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তারা। সৌদি চলচ্চিত্রজগতের নেপথ্য কারিগরদের মতে, এই চুক্তিগুলোর ফলে ভবিষ্যতে মার্কিন স্টুডিওগুলো সৌদি আরবে শুটিং করতে আরও বেশি উৎসাহী হবে এবং বিশ্বজুড়ে কনটেন্ট পরিবেশনায় সৌদির প্রভাব বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করলেই যে মানসম্মত ছবি তৈরি হয় না, তা এখন বুঝতে শুরু করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। বড় বাজেটের অ্যাকশন থ্রিলার ছবি ‘সেভেন ডগস’-এর পেছনে প্রায় ৭০ মিলিয়ন ডলার খরচ করা হয়েছে, যা ইতোমধ্যেই বিশ্বের বৃহত্তম বিস্ফোরণের স্টান্ট করার জন্য গিনেস রেকর্ড গড়েছে। তবে কেবল এমন ব্যয়বহুল আতশবাজি দর্শকদের কতটা টানতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অভিজ্ঞতাহীন জনবলের পেছনে পানির মতো টাকা না ঢেলে টেকসই শিল্প গড়ার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
আশার কথা হলো, বড় বাজেটের পশ্চিমা ধাঁচের ছবিগুলো ব্যর্থ হলেও স্থানীয় প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছোট ও মৌলিক গল্পগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নজর কাড়ছে। যেমন ২০২৩ সালের ব্যঙ্গাত্মক থ্রিলার ‘মানদুব’ সৌদি আরবে হলিউডের ছবি ‘ওনকা’র চেয়েও বেশি আয় করেছে এবং টরন্টো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রশংসিত হয়েছে। একইভাবে ‘আলজারফা’র মতো দেশি ধাঁচের ছবিগুলো বড় বাজেটের বিদেশি ছবির চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সৌদি আরবের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনের গল্পই হতে পারে তাদের বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকার মূল শক্তি। কেবল হলিউডকে নকল না করে নিজেদের বৈচিত্র্যময় কণ্ঠস্বর খুঁজে পেলেই সৌদির এই স্বপ্ন সফল হওয়া সম্ভব। তবে এর জন্য হয়তো বিশ্বকে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।
সূত্র: ভ্যারাইটি