তপ্ত দুপুরে লবণ-মরিচ দিয়ে মাখানো এক বাটি বাতাবি লেবু বা জাম্বুরা কার না প্রিয়? পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফলটি আমাদের অতি পরিচিত হলেও, এর নামের পেছনে লুকিয়ে আছে কয়েকশ বছরের পুরনো বিশ্ব বাণিজ্যের ইতিহাস। ওলন্দাজ বণিকদের জাহাজ থেকে পর্তুগিজদের নামকরণ—সব মিলিয়ে এই বিশালাকার লেবুটি আসলে এক ঐতিহাসিক সাক্ষী।
জাকার্তা থেকে বাংলা: ‘বাটাভিয়া’ থেকে ‘বাতাবি’
অনেকেই হয়তো জানেন না, ‘বাতাবি’ শব্দটি কোনো মৌলিক বাংলা শব্দ নয়। এটি এসেছে সুদূর ইন্দোনেশিয়া থেকে। বর্তমানে যা জাকার্তা, ১৭শ শতাব্দীতে ওলন্দাজ (ডাচ) শাসনামলে তার নাম ছিল বাটাভিয়া (Batavia)। তৎকালীন সময়ে ডাচ বণিকদের জাহাজে করে এই লেবুটি ভারতীয় উপমহাদেশে আসে। বাংলার মানুষ যখন দেখল এই বিশালাকার লেবুটি ‘বাটাভিয়া’ অঞ্চল থেকে আসছে, তখন তারা একে ‘বাতাবিয়া লেবু’ বলে ডাকতে শুরু করে। কালক্রমে উচ্চারণের বিবর্তনে সেটি হয়ে যায় আমাদের আজকের ‘বাতাবি লেবু’।
পর্তুগিজ শব্দ থেকে ‘জাম্বুরা’ শব্দের উৎপত্তি
বাংলাদেশে এই ফলের বিস্তারে ওলন্দাজদের পাশাপাশি বড় ভূমিকা ছিল পর্তুগিজ বণিকদেরও। মজার বিষয় হলো, ফলটির জনপ্রিয় নাম ‘জাম্বুরা’ এসেছে পর্তুগিজ শব্দ ‘Zamboa’ (জাম্বোয়া) থেকে। ওলন্দাজদের প্রভাবে আমরা একে ‘বাতাবি’ বলি, আবার পর্তুগিজদের অনুকরণে ডাকি ‘জাম্বুরা’।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও তাঁর বিখ্যাত ‘খুকী ও কাঠবিড়ালি’ কবিতায় এই ফলের উল্লেখ করেছেন এভাবে—
কাঠবিড়ালি! কাঠবিড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও?
গুড় মুড়ি খাও? দুধ ভাত খাও? বাতাবি নেবু? লাউ?
বেড়াল বাচ্চা? কুকুর ছানা? তাও?
ডাইনী তুমি হোঁৎকা পেটুক!
খাও একা পাও যেথায় যেটুক!
বাতাবি নেবু সকলগুলো!
একলা খেলে ডুবিয়ে নুলো।
তবে যে ভারি লেজ উঁচিয়ে পুটুস পাটুস চাও?
ছোঁচা তুমি। তোমার সঙ্গে আড়ি আমার! যাও!
পুষ্টির আঁধার: সাইট্রাস পরিবারের বড় ফল
বাতাবি লেবু বা জাম্বুরাকে সাইট্রাস পরিবারের সবচেয়ে বড় ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইংরেজিতে একে বলা হয় Pomelo (পোমেলো), যার বৈজ্ঞানিক নাম Citrus maxima। এটি ভিটামিন সি এবং শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের এক চমৎকার উৎস, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
এক সময় সোনারগাঁ থেকে ইন্দোনেশিয়ার জাহাজ চলাচল করত, যার বিবরণ পাওয়া যায় ইবনে বতুতার ডায়েরিতেও। বাতাবি লেবুর প্রতিটি কোষ আজও যেন সেই সুদূর অতীতের বিশ্ব বাণিজ্যের স্মৃতি বহন করে চলেছে। তাই আজ যখন আমরা লবণ-মরিচ দিয়ে এই ফলটি উপভোগ করি, তখন এর সাথে মিশে থাকে কয়েক হাজার মাইল দূরের কোনো এক দ্বীপ এবং কয়েকশ বছরের প্রাচীন এক ইতিহাসের স্বাদ।
এ জাতীয় আরো খবর..