✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-১৬, | ১১:৩৬:২২ |বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচলের ইতিহাসে ২০২৬ সাল এক চরম অনিশ্চয়তার বছর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের আকাশসীমায়।
সিএনএন-এ প্রকাশিত আলেকজান্দ্রা স্কোরেস ও ক্রিস ইসিডোরের এক গভীর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই যুদ্ধের ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয় এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হতে যাচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা। একদিকে আকাশছোঁয়া টিকিটের দাম, অন্যদিকে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিলের ফলে টিকিট প্রাপ্তিতে চরম ভোগান্তি— সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে আকাশপথের যাত্রীরা এক ভয়ংকর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
তেলের বাজারের অগ্নিমূল্য ও বিমান ভাড়ার সমীকরণ
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলায় তেলের দাম বর্তমানে আকাশচুম্বী এবং দিন দিন এটি লাগামছাড়া হচ্ছে। ফলে বিমান সংস্থাগুলোর জ্বালানি খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এই বাড়তি খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে সাধারণ ভ্রমণকারীদের পকেটেই আঘাত করতে পারে।
ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) স্কট কিরবি গত সপ্তাহে সিএনবিসি-কে জানিয়েছেন, ভাড়ার ওপর এই প্রভাব সম্ভবত খুব দ্রুতই শুরু হবে। তেলের দাম বাড়ার কারণে বিমান সংস্থাগুলো তাদের ব্যবসায়িক কৌশলে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর তেলের বাজার উত্তাল হয়ে ওঠে। গত বৃহস্পতিবার তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। গত চার বছরের মধ্যে এই প্রথম তেলের দাম ১০০ ডলারের উপরে পৌঁছাল। যদিও সপ্তাহের শেষ দিকে এটি সামান্য কমে ৯৯ ডলারে নেমে আসে।
ফ্লাইট বাতিল ও যাতায়াতে বিঘ্ন
এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু তেলের দামেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি বিমান চলাচলেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়েছে। বিমান চলাচল সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সিরিয়াম’ (Cirium)-এর তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত এই অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এটি বিমান সংস্থাগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিশাল নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আমেরিকান এয়ারলাইন্সের সাবেক নির্বাহী রব ব্রিটন পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, তেলের সরবরাহ এখন পর্যন্ত খুব বেশি বাধাগ্রস্ত না হলেও এর দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। তার মতে, ‘যদি জ্বালানির দাম এভাবে বাড়তি থাকে, তবে বিমানের ভাড়াও নিশ্চিতভাবে বাড়বে।’ এটি বোঝার জন্য রকেট সায়েন্স জানার প্রয়োজন নেই; সাধারণ হিসাব অনুযায়ী, জ্বালানির দাম যে হারে বাড়বে, টিকিটের দামও প্রায় একই অনুপাতে বাড়তে পারে।
শ্রমিকদের বেতনের পর একটি বিমান সংস্থার দ্বিতীয় বৃহত্তম খরচ হলো জ্বালানি। ব্রিটন জানান, একটি এয়ারলাইন্সের মোট খরচের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশই ব্যয় হয় এই জেট ফুয়েলের পেছনে। আর এই খরচ পুরোটাই নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, জ্বালানির দাম বাড়লে বিমান সংস্থাগুলো দেরি না করে খুব দ্রুত টিকিটের দাম বাড়িয়ে বাড়তি খরচের সমন্বয় করে থাকে।
চাহিদা ও জোগানের জটিল সমীকরণ
তবে, জ্বালানির দাম বাড়লেই বিমান সংস্থাগুলো সবসময় সেই বাড়তি খরচ যাত্রীদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না। এভিয়েশন নিউজলেটার ‘ফ্রম দ্য ট্রে টেবিল’-এর লেখক জ্যাক গ্রিফ মনে করেন, পুরো শিল্পজুড়ে খরচ বাড়লেও যাত্রীদের কাছ থেকে সেই টাকা আদায় করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ফ্লাইটের দাম নির্ধারণে কেবল জ্বালানি বা পরিচালনার খরচই শেষ কথা নয়; এর পেছনে টিকিটের চাহিদার মতো আরও অনেক জটিল সমীকরণ কাজ করে।
যদি মুদ্রাস্ফীতি বা বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ার কারণে মানুষ এই গরমে ভ্রমণের পরিকল্পনা কমিয়ে দেয়, তবে বিমান সংস্থাগুলো বিপাকে পড়বে। তখন খরচ যতই বাড়ুক না কেন, তারা চাইলেই ভাড়া খুব বেশি বাড়াতে পারবে না। সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্সের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও এই অনিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। যাত্রীরা সাধারণত ভ্রমণের অনেক আগেই টিকিট কিনে রাখেন, তাই জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সারচার্জ বসানো বা খরচ কমিয়ে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ফ্লাইট কমিয়ে দেওয়ার দুঃসংবাদ
জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম শুধু ভাড়াই বাড়াবে না, এটি অন্যভাবেও যাত্রীদের ক্ষতি করতে পারে। অনেক ফ্লাইট আগে লাভজনক থাকলেও এখন তেলের দামের কারণে সেগুলো লোকসানি হয়ে পড়েছে। ফলে বিমান সংস্থাগুলো এখন অনেক রুটে তাদের ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবছে। যখন ফ্লাইটের সংখ্যা কমে যাবে, তখন বাজারে টিকিটের সংকট তৈরি হবে এবং এই সংকটই ভাড়াকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
বিশেষজ্ঞ জ্যাক গ্রিফ মনে করেন, যে ফ্লাইটগুলো থেকে খুব একটা লাভ হচ্ছে না, সেগুলো এখন সরাসরি বাতিলের তালিকায় চলে আসবে। এছাড়া নিরাপত্তার অভাবের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক লাভজনক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট এরই মধ্যে স্থগিত করা হয়েছে, যাতে বিমান সংস্থাগুলো বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে।
স্পিরিট এয়ারলাইন্সের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি দেউলিয়া হওয়া ‘স্পিরিট এয়ারলাইন্স’ (Spirit Airlines)-এর জন্য বড় বিপদ ডেকে এনেছে। সংস্থাটি বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছিল যে তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হতে পারে। যদিও পাওনাদারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু তেলের দাম বাড়ায় সেই পরিকল্পনা এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে। যদি স্পিরিট বাজার থেকে পুরোপুরি সরে যায়, তবে বাজারে সস্তা টিকিটের প্রতিযোগিতা কমে যাবে এবং বড় বিমান সংস্থাগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ পাবে।

জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা সামাল দেওয়ার চেষ্টা
একটি দীর্ঘ পাল্লার বোয়িং ৭৭৭ বিমানে ৪৫ হাজার গ্যালনের বেশি জ্বালানি ধরে। সামান্য দাম বৃদ্ধিতেই তাই এয়ারলাইন্সগুলোর বিশাল অঙ্কের ধাক্কা লাগে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বিমান সংস্থাগুলো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে —
• সরাসরি ভাড়া বৃদ্ধি : রয়টার্সের তথ্যমতে, কোয়ান্টাস, এসএএস এবং এয়ার নিউজিল্যান্ড এই সপ্তাহে সরাসরি বিমানের ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে।
• আইনি বাধ্যবাধকতা : ট্রাভেল অ্যাপ Going.com-এর মুখপাত্র ক্যাটি নাস্ত্রো জানান, বিমান সংস্থাগুলো নিজেরা জোট বেঁধে ভাড়া বাড়াতে পারে না কারণ এটি আইনত দণ্ডনীয়। তবে পরিস্থিতি সবার জন্য এক হওয়ায় সবাই একই পথে হাঁটছে। তিনি আশঙ্কা করেন, আগামী সপ্তাহ থেকে অনেকে যুদ্ধের অযুহাতেও দাম বাড়াতে পারে (Excuseflation)।
• হেজিং (Hedging) : লুফথানসা বা রায়ানএয়ার-এর মতো সংস্থাগুলো আগে থেকে নির্দিষ্ট দামে জ্বালানি কেনার চুক্তি করে রাখে। তবে সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্স দীর্ঘ ৫০ বছর পর এই পদ্ধতি বন্ধ করে দিয়েছে কারণ এটি এখন আর লাভজনক হচ্ছে না।
আধুনিকায়ন ও বিকল্প জ্বালানি
জ্বালানি খরচ কমাতে আমেরিকান এয়ারলাইন্স ‘এ৩২১এক্সএলআর’ (A321XLR) মডেলের নতুন বিমান যুক্ত করছে, যা পুরনো বিমানের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ কম জ্বালানি খরচ করে। আবার অনেক এয়ারলাইন্স টেকসই বিমান জ্বালানি (Sustainable Aviation Fuel) ব্যবহারের দিকে নজর দিচ্ছে। যদিও ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে এর ব্যবহার মাত্র ০.৭ শতাংশ।
অন্যদিকে, ডেল্টা এয়ারলাইন্স অন্যদের চেয়ে আলাদা কারণ তাদের নিজস্ব তেল শোধনাগার রয়েছে। এটি তাদের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে এবং বাড়তি খরচ থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়।

কবে বাড়বে ভাড়া ও যাত্রীদের করণীয়
বিমানের ভাড়া মূলত নির্ভর করে টিকিটের চাহিদা এবং সিটের জোগানের ওপর। ডেল্টা এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র ড্রেক কাস্টানেডা জানান, তারা পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছেন। তবে ভাড়া এলাকা, সময় এবং প্রতিযোগিতার ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তিত হয়।
মার্কিন পরিবহন সচিব শন ডাফি অবশ্য আশা প্রকাশ করেছেন যে জ্বালানি বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
বিশেষজ্ঞ জ্যাক গ্রিফের পরামর্শ হলো, যারা আগামী জুন বা জুলাই মাসে ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তারা যেন এখনই টিকিট কিনে রাখেন। তবে অবশ্যই পরিবর্তনযোগ্য বা ফেরতযোগ্য (Refundable) টিকিট কেনা ভালো, যাতে পরে ভাড়ার দাম কমলে আগের টিকিট বাতিল করে নতুন করে বুক করার সুযোগ থাকে।
লেখক : আলেকজান্দ্রা স্কোরেস ও ক্রিস ইসিডোর, সিএনএন