ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে বিএনপি। সরকার গেজেট প্রকাশ করলেই শপথ নেবেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে নতুন প্রশাসনের রূপ রেখা নিয়ে। প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতার স্বাদ পেলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে মসনদে বসাটা খুব একটা স্বস্তিদায়ক হবে না বলেই মনে করছে সচেতন মহল।
সরকার গঠন হওয়ার পর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এমপি-মন্ত্রীরা পড়তে পারেন নানা প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জের মুখে। আওয়ামী লীগ প্রশাসনের হর্তাকর্তারা পালিয়ে যাওয়ার পর অর্থনীতির যে ভঙ্গুর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে, পররাষ্ট্রনীতিতে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলায় যে দুর্বলতা তৈরি হয়েছে- তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি রয়ে গেছে উদ্বেগজনক অবস্থানে। এছাড়া উচ্চ ব্যাংক-সুদের কারণে ধুঁকছে বিনিয়োগ খাত; যার স্পষ্ট নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান তৈরির প্রক্রিয়ায়।
এমতাবস্থায় তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের চলার পথ মসৃণ হবে না বলে ধরেই নেওয়া যায়। তাদের সামনে আরও যেসব সঙ্কট পড়তে পারে তার মধ্যে অন্যতম- রাজস্ব আদায়। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক চাপে থাকা নাগরিকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় না করতে পারলে উচ্চাভিলাসী ইশতেহারও বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া দ্রব্যমূল্য স্বস্তিদায়ক রাখা, লাখ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি, ফ্যামিলি ও কৃষি কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষায় সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার দরকার, যা নেই।
খেলাপি ঋণ, লুটপাট ও অর্থ পাচারের কারণে সরকারি ব্যাংকগুলো নাজুক হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকেও অনুরূপ চিত্র দেখা যাচ্ছে। এরওপর এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে রেখেছে সরকার।
আবার বিদেশি ঋণের বোঝাও দেশের কাঁধে ঝুলছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতি সচল রেখে এসব ঋণের কিস্তি চালিয়ে যেতে হবে, নতুন বিনিয়োগও আকর্ষণ করতে হবে। যা নির্বাচিত সরকারের জন্য আরেকটি প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ব্রাসেলস ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ তাদের এক নিবন্ধে নতুন সরকারের জন্য অন্তত পাঁচটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করছে, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ‘আওয়ামী লীগকে ঘিরে রাজনৈতিক সমঝোতার মতো জটিল বিষয়’।
অবশ্য সংস্থাটি এও বলছে যে, নির্বাচিত সরকার হওয়ার কারণে সমস্যা সমাধানে কাজ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নতুন সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা নিতে পারবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর ‘মব’ সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন কারণে আইনশৃঙ্খলার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণটা এবং এটি করতে যে রাষ্ট্র বা সরকারের সক্ষমতা আছে প্রাথমিকভাবে সেটি প্রমাণ করাই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ ইস্যু ছাড়াও নতুন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, চীনকে সন্তুষ্ট রেখে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক চাপ, রোহিঙ্গা ইস্যুতে শক্ত অবস্থান নেওয়াটাই নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় জনগণকে বিষিয়ে তোলার নেপথ্যে যে কারণটি বেশি কাজ করেছে তা ছিল দুর্নীতি ও দলীয়করণ। রাষ্ট্রের প্রায় সব খাতে দলীয় কর্মী নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো সেবার পরিবর্তে রাজনৈতিক কার্যালয়ে পরিণত করা হয়েছিল। নেতাকর্মীদের ঠিকাদারী ব্যবসার আড়ালে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ লুট ও অপচয় করা হয়েছে, সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসাটাও বিএনপির জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
এছাড়া শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ ও শৃঙ্খলা ফেরানো, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির অবসান করে নাগরিকদের জন্য সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা নতুন সরকারের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে।
এ জাতীয় আরো খবর..