ইসলামে দায়িত্ব ও অধিকার কখনো আলাদা নয়। মানুষের প্রতিটি সিদ্ধান্তই ইবাদতের মর্যাদা পেতে পারে, যদি তা ন্যায় ও সততার ভিত্তিতে হয়। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভোট তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব— যা শুধু নাগরিক অধিকার নয়, বরং একজন মুসলমানের জন্য একটি পবিত্র আমানত। সঠিকভাবে ভোট প্রদান একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে; আবার অবহেলা ও খেয়ানত সমাজকে ঠেলে দিতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে।
ভোটকে ইসলামে পবিত্র আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এটি নাগরিকের অধিকার হলেও একজন মুসলমান এই অধিকারের অপব্যবহার করতে পারেন না। অর্থের বিনিময়ে ভোট বিক্রি করা যেমন হারাম, তেমনি ভোট চুরি করাও অন্যান্য চুরির মতোই গুরুতর অপরাধ। এটি সরাসরি হাক্কুল ইবাদ লঙ্ঘনের শামিল।
ন্যায়–অন্যায়, হক–বাতিল, ভালো–মন্দ, এমনকি ইমান ও কুফরের পার্থক্য নির্ধারণেও ভোট একটি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। কুরআন–সুন্নাহর আলোকে ভোটের বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নিম্নে তুলে ধরা হলো—
ভোট— একটি সুপারিশ
ভোটের মাধ্যমে দেওয়া সুপারিশ যেন ন্যায়সংগত ও বাস্তবধর্মী হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
مَنْ يَشْفَعْ شَفَاعَةً حَسَنَةً يَكُنْ لَهُ نَصِيبٌ مِنْهَا ۖ وَمَنْ يَشْفَعْ شَفَاعَةً سَيِّئَةً يَكُنْ لَهُ كِفْلٌ مِنْهَا
‘যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজে সুপারিশ করে, তাতে তার অংশ রয়েছে। আর যে মন্দ কাজে সুপারিশ করে, তাতেও তার অংশ রয়েছে।’ (সুরা নিসা: আয়াত ৮৫)
ভোট— একটি সাক্ষ্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যা সাক্ষ্যকে কবিরা গুনাহ বলেছেন। একজন ভোটার মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একজন সাক্ষ্যদাতা। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ
‘হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর জন্য সাক্ষীরূপে।’ (সুরা নিসা: আয়াত ১৩৫)
ভোট— অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
ভোট হতে পারে নীরব কিন্তু কার্যকর প্রতিবাদ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ
‘তোমাদের যে কোন ব্যক্তি যে কোন অন্যায় কাজ দেখবে সে যেন তা বল প্রয়োগে বাধা প্রদান করে। এভাবে সম্ভব না হলে মুখে বাধা প্রদান করবে। সম্ভব না হলে সে অন্যায়কে ঘৃণা করবে।’ (মুসলিম, মিশকাত ৫১৩৭)
ভোট— জুলুমের বিরুদ্ধে মজলুমের রায়
ভোট জুলুম প্রতিরোধের একটি শান্তিপূর্ণ উপায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم هَذَا نَنْصُرُهُ مَظْلُومًا فَكَيْفَ نَنْصُرُهُ ظَالِمًا قَالَ تَأْخُذُ فَوْقَ يَدَيْهِ
‘তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে যালিম হোক অথবা মাযলুম। তিনি (আনাস) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! মাযলুমকে সাহায্য করব, তা তো বুঝলাম। কিন্তু যালিমকে কি করে সাহায্য করব? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তার হাত ধরে তাকে বিরত রাখবে। (অর্থাৎ তাকে যুলুম করতে দিবে না)।’ (বুখারি ২৪৪৪)
ভোট— একটি দাওয়াত
ভোট ইসলামের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার একটি কৌশলগত দাওয়াত। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلۡتَكُنۡ مِّنۡكُمۡ اُمَّۃٌ یَّدۡعُوۡنَ اِلَی الۡخَیۡرِ وَ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ یَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡكَرِ ؕ وَ اُولٰٓئِكَ هُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ
‘আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের প্রতি আহবান করবে, ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।’ (সুরা আল-ইমরান: ১০৪)
ভোট— ঐক্যের সোপান
অনৈক্য মুসলমানদের দুর্বল করে; সঠিক ভোট ঐক্য গঠনের মাধ্যম হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَ اعۡتَصِمُوۡا بِحَبۡلِ اللّٰهِ جَمِیۡعًا وَّ لَا تَفَرَّقُوۡا ۪ وَ اذۡكُرُوۡا نِعۡمَتَ اللّٰهِ عَلَیۡكُمۡ اِذۡ كُنۡتُمۡ اَعۡدَآءً فَاَلَّفَ بَیۡنَ قُلُوۡبِكُمۡ فَاَصۡبَحۡتُمۡ بِنِعۡمَتِهٖۤ اِخۡوَانًا ۚ
‘আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না। আর তোমরা তোমাদের উপর আল্লাহর নিয়ামতকে স্মরণ কর, যখন তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলে। তারপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালবাসার সঞ্চার করেছেন। অতঃপর তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই-ভাই হয়ে গেল।’ (সুরা আল-ইমরান: ১০৩)
ভোট— একটি পবিত্র আমানত
সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকেই দায়িত্ব দেওয়া ভোটারের কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানত তার হকদারের কাছে ফিরিয়ে দিতে।’ (সুরা নিসা: আয়াত ৫৮)
ভোট— প্রতিনিধি নির্বাচনের উপায়
যোগ্যতা ও সক্ষমতাই নেতৃত্বের মানদণ্ড। হজরত তালুত (আ.)-এর ঘটনা থেকে বোঝা যায়—
قَالَ اِنَّ اللّٰهَ اصۡطَفٰىهُ عَلَیۡكُمۡ وَ زَادَهٗ بَسۡطَۃً فِی الۡعِلۡمِ وَ الۡجِسۡمِ ؕ وَ اللّٰهُ یُؤۡتِیۡ مُلۡكَهٗ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ اللّٰهُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ
‘সে বলল, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাকে তোমাদের উপর মনোনীত করেছেন এবং তাকে জ্ঞানে ও দেহে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহ যাকে চান, তাকে তাঁর রাজত্ব দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ২৪৭)
ভোট— সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ
সুরা আর-রুমের ২–৪ আয়াতে বোঝা যায়— মুমিনরা নীরব দর্শক ছিল না; তারা সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তাই ভোটেও নীরবতা কাম্য নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
غُلِبَتِ الرُّوۡمُ - فِیۡۤ اَدۡنَی الۡاَرۡضِ وَ هُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ غَلَبِهِمۡ سَیَغۡلِبُوۡنَ ۙ - فِیۡ بِضۡعِ سِنِیۡنَ ۬ؕ لِلّٰهِ الۡاَمۡرُ مِنۡ قَبۡلُ وَ مِنۡۢ بَعۡدُ ؕ وَ یَوۡمَئِذٍ یَّفۡرَحُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ
‘রোমানরা পরাজিত হয়েছে নিকটবর্তী অঞ্চলে, আর তারা তাদের এ পরাজয়ের পর অচিরেই বিজয়ী হবে, কয়েক (তিন থেকে নয়) বছরের মধ্যেই; (কোন্ কাজ হবে) আগে ও (কোন্ কাজ হবে) পরে সে ফয়সালা আল্লাহরই। সেদিন মুমিনরা আনন্দ করবে।’ (সুরা আর-রুম: আয়াত ২-৪)
ভোট— নাগরিকের মতামত
ভোট রাষ্ট্র পরিচালনায় নাগরিকের মতামত প্রদানের মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ
‘কর্মসম্পাদনে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করো।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৫৯)
ভোট শুধু একটি কাগজে সিল মারা নয়—এটি একটি ইবাদত, একটি সাক্ষ্য এবং একটি আমানত। একজন মুসলমানের ভোট তার ইমান, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। সঠিক ভোট একটি সমাজকে আলোকিত করতে পারে, আর ভুল ভোট ডেকে আনতে পারে অন্ধকার। তাই কুরআন–সুন্নাহর আলোকে বিবেক, ন্যায় ও আল্লাহভীতিকে সামনে রেখে ভোট দেওয়া প্রত্যেক মুসলমান নাগরিকের দ্বীনি ও সামাজিক দায়িত্ব।
এ জাতীয় আরো খবর..