✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১১-০৬, | ১৭:১৪:২৮ |ডিজিটাল ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান উয়েনোর পতন ঘিরে সৃষ্ট রাজনৈতিক ও আর্থিক সংকটের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা। বৃহস্পতিবার নিজ দলের সমর্থন হারানোর পর এবং তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি পদ ছাড়েন। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
উয়েনোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ গ্রাহক নিজেদের ব্যাংক হিসাবের অর্থ ব্যবহারের সুযোগ হারিয়েছেন। এতে দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে পেনা বলেন, অভিশংসন প্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার প্রয়োগ করতে তিনি সিনেটে হাজির হবেন। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত অহংকারের কারণে নয়, বরং জবাবদিহি করা এবং ব্যাখ্যা দেওয়া প্যারাগুয়ের জনগণের কাছে আমার দায়িত্ব।’
উয়েনো ব্যাংকে আটকে পড়া গ্রাহকদের অর্থ দ্রুত ফেরত দেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি। পেনা বলেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ দুটি কাজই একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া জরুরি।
পেনার পদত্যাগের পর দেশটির অর্থবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। প্যারাগুয়ের সার্বভৌম বন্ডের দাম কমে যায়। দেশটির মুদ্রা গুয়ারানির দর প্রতি ডলারে ৬ হাজার ৫০০-এর নিচে নেমে যায়। দিন শেষে প্রতি ডলারের বিপরীতে গুয়ারানির বিনিময়মূল্য দাঁড়ায় ৬ হাজার ৪৯০-এ, যা এক দিনে প্রায় ৫ শতাংশ দরপতন।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক উয়েনোর কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করার পর সংকটের সূত্রপাত হয়। ব্যাংকটির ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতা-সংক্রান্ত শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর জেরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান পদত্যাগ করেছেন। পাশাপাশি উয়েনোর আট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলে তারা পরে আত্মসমর্পণ করেন।
একটি ছোট ফিনটেক প্রতিষ্ঠান থেকে দ্রুত মাঝারি আকারের ব্যাংকে পরিণত হয়েছিল উয়েনো। দেশটির ৬৫ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ গ্রাহক ছিল প্রতিষ্ঠানটির। এ ছাড়া সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও পেনশন তহবিলের অর্থসহ প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বেও ছিল ব্যাংকটি।
প্রতিষ্ঠানটির পতনে গ্রাহকেরা নিজেদের হিসাবে থাকা অর্থ তুলতে বা ব্যবহার করতে পারছেন না। ব্যক্তিগত সঞ্চয়, দৈনন্দিন লেনদেন ও সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকটির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন বহু প্যারাগুয়েবাসী। ফলে সংকটটি দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নেয়।
বিরোধী আইনপ্রণেতারা পেনার বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাত, পেনশন তহবিলের অর্থের অপব্যবহার এবং ব্যাংকটিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি থেকে আড়াল করার অভিযোগ তুলেছেন। তবে কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পেনা। তার দাবি, এটি মূলত নিয়ন্ত্রক সংক্রান্ত বিষয় এবং এর নিষ্পত্তি আদালতের মাধ্যমে হওয়া উচিত।
২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া পেনার বিরুদ্ধে উয়েনোর সাবেক মালিকানাধীন ব্যবসায়িক গোষ্ঠী গ্রুপো ভাজকেজের সঙ্গে পুরোনো সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা ছিল ওই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে। পেনা জানিয়েছেন, ওই মাসেই তিনি গোষ্ঠীটির সঙ্গে নিজের অংশীদারত্ব বিক্রি করে দেন এবং ব্যাংকটির কার্যক্রমে কোনো অনৈতিক ভূমিকা রাখেননি।
উয়েনোর একজন গ্রাহক ফেলিপে রদ্রিগেজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পেনা আমানতকারীদের অর্থ নিয়ে খেলছেন। এর শাস্তি হওয়া উচিত।’ এ সময় তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানার বিরুদ্ধেও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন।
পেনার পদত্যাগের পর উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কথা রয়েছে ভাইস প্রেসিডেন্ট আলিয়ানার। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি পেনার কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। আর্থিক সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত নিজের প্রেসিডেন্ট হওয়ার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
উয়েনোর পতনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই সংকট এখন প্যারাগুয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ব্যাংকিং খাত এবং অর্থনীতির জন্য বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। গ্রাহকদের অর্থ ফেরত এবং আর্থিক খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারই এখন দেশটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।