✕


অভিশংসনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা হেগসেথের

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-১১-০৬, | ১৭:১২:২৪ |

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ তার বিরুদ্ধে কংগ্রেসে অভিশংসনের উদ্যোগ মোকাবিলার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধকে ‘সাহসী ও ঐতিহাসিক’ অভিযান হিসেবে উল্লেখ করে এর পক্ষে সাফাই গেয়েছেন তিনি।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইরান যুদ্ধের কারণে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় এসব কথা বলেন হেগসেথ। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ সব তথ্য জানা যায়। 

কংগ্রেসে তার বিরোধীদের সমালোচনা জোরালো হওয়ার মধ্যেই হেগসেথের এই বক্তব্য প্রকাশ পেল। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আপাতত প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত করার সম্ভাবনা নাকচ করে তাকে কাজের জন্য প্রশংসা করেছেন।

মার্কিন কংগ্রেসের হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘পিট হেগসেথ এখনো দায়িত্বে রয়েছেন কেন?’

সাবেক ফক্স নিউজ উপস্থাপক হেগসেথ ট্রাম্প প্রশাসনের একজন বিতর্কিত সদস্য। ইরান যুদ্ধ পরিচালনা, শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বরখাস্ত এবং আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে তার টানাপোড়েন নিয়ে নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেও সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদনের জন্য প্রশাসনের প্রচেষ্টার সময় আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে তার বিরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। তারা জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম ও হেগসেথের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত করা হবে। এর মধ্যে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে জানিয়েছেন কংগ্রেসের কর্মকর্তারা।

অন্যদিকে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য থমাস ম্যাসি আগামী সপ্তাহে হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব পুনরায় উত্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন। এক্সে তিনি সতর্ক করে লিখেছেন, আগামী বছর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার পর হেগসেথের জন্য আরও কঠিন পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। তার ভাষায়, তখন শুনানি ও বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে।

চার মিনিটের বেশি সময়ের ভিডিও বার্তায় নিজের নেতৃত্বের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন হেগসেথ। তিনি পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত, বৈচিত্র্যবিষয়ক উদ্যোগ বন্ধ এবং ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে নিজের সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন।

অভিশংসনের উদ্যোগকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকেও দুইবার অভিশংসনের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। হেগসেথের ভাষায়, ‘এটি ব্যক্তিগতভাবে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার রাজনীতি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এটি কাজ করেনি, আমার ক্ষেত্রেও করবে না।’

এদিকে বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, হেগসেথ ‘অসাধারণ কাজ করেছেন’। তার বিরুদ্ধে বিরোধিতার অন্যতম কারণ হিসেবে জেনারেলদের বরখাস্তের বিষয়টি উল্লেখ করেন প্রেসিডেন্ট।

ট্রাম্প বলেন, সামরিক বাহিনীতে অনেক চার তারকা জেনারেল ছিলেন এবং তাদের অনেকে তার ভাষায় ‘ওয়োক’ বা অতিরিক্ত প্রগতিশীল মনোভাবের ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি ওয়োক জেনারেল পছন্দ করি না। সম্ভবত এ কারণেই তার বিরোধিতা করা হচ্ছে।’

ভেনেজুয়েলা ও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানেও হেগসেথের ভূমিকার প্রশংসা করেন ট্রাম্প। তার দাবি, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান অসাধারণ হয়েছে এবং ইরানে সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের কাঙ্ক্ষিত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে।

তবে নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ পর্যালোচনা করতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও হেগসেথের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে। একজন ট্রাম্প উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে হেগসেথকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে।

বুধবার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন, ইরান যুদ্ধ আদৌ সার্থক হয়েছে কি না। তার মন্তব্য, এই যুদ্ধের কারণেই কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। এতে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করার বিষয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত পেন্টাগনের নেতৃত্ব দিতে হেগসেথ ‘১০০ শতাংশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’।

ভিডিও বার্তায় হেগসেথ আইনপ্রণেতাদের কাছে প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রস্তাব অনুমোদনেরও আহ্বান জানান। তার দাবি, ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই এই ‘সাহসী ও ঐতিহাসিক’ যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে। যুদ্ধের বিষয়ে কার কী মত, তা বিবেচনায় না নিয়ে সামরিক বাহিনী পুনর্গঠনের কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিসও হেগসেথের সমালোচনা করেছেন। সিবিএস নিউজকে তিনি বলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সামনে কঠিন পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে তার টানাপোড়েন ট্রাম্প প্রশাসনের ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট পাসের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এ ছাড়া ইউক্রেন নীতি এবং লাতিন আমেরিকার জলসীমায় মাদক পাচারের সন্দেহে নৌযানগুলোর ওপর মার্কিন সামরিক হামলা নিয়েও ডেমোক্র্যাটদের তদন্তের মুখে পড়তে পারেন হেগসেথ। এসব হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা।

আগামী বছর প্রতিনিধি পরিষদের সশস্ত্র বাহিনী-বিষয়ক কমিটির নেতৃত্ব দিতে পারেন ডেমোক্র্যাট নেতা অ্যাডাম স্মিথ। তিনি ইরান যুদ্ধ থেকে শুরু করে সামরিক বাহিনীর নিরপেক্ষ চরিত্র ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ সব বিষয়েই কঠোর নজরদারির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ফলে ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন সত্ত্বেও হেগসেথের জন্য রাজনৈতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও অভিশংসনের উদ্যোগ কতটা এগোয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। 

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..