✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-০৫, | ১১:৩১:২৩ |মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে কিছুদিন অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও নন-ইউরিয়া সার আমদানি আবার গতি পেয়েছে। রবি ও বোরো মৌসুমের আগে সরবরাহ ও মজুদ বাড়াতে চলতি সেপ্টেম্বরেই ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি), মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) ও ট্রিপল সুপার ফসফেটের (টিএসপি) সাতটি জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
সার নিয়ে দেশের পথে থাকা জাহাজগুলোর মধ্যে একটি ডিএপি, চারটি এমওপি এবং দুটি টিএসপি বহন করছে। এসব জাহাজে আসছে মোট আড়াই লাখ টন সার। এর মধ্যে দেড় লাখ টন এমওপি, ৬০ হাজার টন টিএসপি ও ৪০ হাজার টন ডিএপি। আগামী মাসে ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি নিয়ে আরো প্রায় ১০টি জাহাজ দেশে আসার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন ও কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বরে টিএসপি বহনকারী দুটি জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর মধ্যে একটি ৮ সেপ্টেম্বর এবং অন্যটি ১১ সেপ্টেম্বর পৌঁছাতে পারে। দুটি জাহাজে মোট ৬০ হাজার টন টিএসপি রয়েছে, যা মরক্কো থেকে আমদানি করা হচ্ছে। একই দেশ থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি নিয়ে আরেকটি জাহাজও ৮ সেপ্টেম্বর দেশের বন্দরে পৌঁছানোর কথা।
এছাড়া চলতি মাসে মোট দেড় লাখ টন এমওপি দেশে আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার টন করে দুটি লটে মোট ৭০ হাজার টন এবং কানাডা থেকে ৪০ হাজার টন করে দুটি লটে মোট ৮০ হাজার টন এমওপি আমদানি করা হচ্ছে। চারটি লটের মধ্যে দুটি চলতি সপ্তাহে এবং বাকি দুটি যথাক্রমে ১৩ ও ১৫ সেপ্টেম্বর দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বিএডিসির হিসাবে, চলতি সেপ্টেম্বর থেকে আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পিক সিজনে দেশে ডিএপির চাহিদা হবে ১১ লাখ ২৭ হাজার টন। এর বিপরীতে বর্তমানে জাহাজে থাকা সারসহ আগামী জানুয়ারির মধ্যে আমদানি প্রক্রিয়াধীন ও আলোচনাধীন ডিএপির পরিমাণ ৬ লাখ ৮০ হাজার টন।
একই সময়ে এমওপির চাহিদা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৭২ হাজার টন। চলতি মাসে দেশে আসার অপেক্ষায় থাকা চালানসহ আমদানি প্রক্রিয়াধীন ও আলোচনাধীন এমওপির পরিমাণ ৬ লাখ ৮০ হাজার টন।
অন্যদিকে পিক সিজনে টিএসপির চাহিদা হবে ৫ লাখ ১৯ হাজার টন। এর বিপরীতে চূড়ান্ত আমদানি প্রক্রিয়ায় থাকা এবং জিটুজি চুক্তির আওতায় আলোচনাধীন টিএসপির পরিমাণ ৩ লাখ ৬০ হাজার টন।
সেপ্টেম্বরে সাতটি জাহাজে সার আসার পর আগামী অক্টোবরেও ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি নিয়ে আরো প্রায় ১০টি জাহাজ দেশে আসার কথা রয়েছে। এসব চালানের আমদানি প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে।
বিএডিসির সার আমদানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতি মাসে ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি নিয়ে ১০-১২টি করে জাহাজ দেশে আসবে। সেপ্টেম্বরের চালানগুলো এরই মধ্যে দেশের পথে রয়েছে। অক্টোবরের চালানগুলোর মধ্যে কয়েকটির লোডিং শেষ হয়েছে, আর কয়েকটি এখনো লোডিং পর্যায়ে রয়েছে। পরবর্তী মাসগুলোর চালানের ঋণপত্রও (এলসি) দ্রুত খোলা হবে।’
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, অক্টোবরের শেষ দিক থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশে সারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময়ে শীতকালীন সবজি, আলু, পেঁয়াজ ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়। একই সঙ্গে দেশের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধানের আবাদও শুরু হয়। ফলে বছরের মোট সারের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশই পড়ে এ শীতকালীন মৌসুমে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সামনে রবি ও বোরো মৌসুম। বর্তমানে যে পরিমাণ সার আমদানি হচ্ছে, তা চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে সামনের মৌসুমে সারের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকবে। তাই এখন থেকেই সরবরাহ ও মজুদ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর না করে দেশীয় কারখানাগুলোতেও উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। অন্যান্য সারে সম্ভব না হলেও অন্তত ইউরিয়া উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারি। এজন্য আমদানি স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনও বাড়াতে হবে।’
আমন মৌসুম ঘিরে বেশ কিছুদিন ধরে সার না পাওয়ার অভিযোগ করছিলেন দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকরা। তারা ডিলারের কাছে সার না পাওয়া, বাড়তি দামে কিনতে বাধ্য করার মতো নানা অভিযোগও করেন। এরই মধ্যে কুড়িগ্রামে ডিলারের গুদাম ভেঙে কৃষকদের সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে, যা দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কঠোর অবস্থান নেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে বেশ কয়েকজন কৃষি কর্মকর্তাকে বদলিও করে সরকার। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হচ্ছে সারের কোনো সংকট নেই।
সার্বিক বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘সার আমদানি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রতি মাসের চাহিদার হিসাব অনুযায়ী কোনো মাসে বেশি, কোনো মাসে কম সার আমদানি করা হয়। বছরে আমাদের প্রায় ৫০-৫৫ লাখ টন সার আমদানি করতে হয়। এত সার একসঙ্গে আনা সম্ভব নয়, আবার রাখার মতো পর্যাপ্ত গুদামও নেই। দীর্ঘদিন গুদামে রাখলে সারের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই চাহিদা অনুযায়ী সার আমদানি করে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়।’
সার আমদানি নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা প্রতিটি সার ন্যূনতম তিনটি উৎস থেকে আমদানি করি, যাতে একটি উৎস থেকে সরবরাহ ব্যাহত হলে অন্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা যায়। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব ও কাতার থেকে কিছুদিন সার আমদানি বন্ধ ছিল। পরে তারা হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প রুটে সরবরাহ শুরু করেছে। আমরাও এখন হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সার আমদানি করছি। ফলে আমদানি নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই।’