মেরিন ড্রাইভে ভ্রমণ: কোথায় যাবেন, কী দেখবেন, খরচ কত

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-০২, | ০১:৪৪:২৫ |
মানসিক ক্লান্তি আর একঘেয়েমি কাটাতে প্রকৃতির কাছে ছুটে যেতে চান? যেখানে চোখ রাখলেই পাহাড়ের সবুজ, মেঘের আনাগোনা আর দিগন্তজোড়া নীল সমুদ্র। এমনই এক প্রশান্তির ঠিকানা কক্সবাজার-টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ। এক পাশে বঙ্গোপসাগরের ঢেউ, অন্য পাশে পাহাড় আর ঝাউবনের সারি— মাঝখান দিয়ে এগিয়ে চলা এই পথ ভ্রমণপিপাসুদের নিয়ে যায় প্রকৃতির খুব কাছাকাছি। সমুদ্রের নীল জলরাশি আর পাহাড়ের সবুজের মেলবন্ধনে পুরো পথটিই হয়ে উঠেছে উপকূলের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণপথ। পথে পথে বদলে যায় দৃশ্য, আর ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

কোথায় এই মেরিন ড্রাইভ?

কক্সবাজারের কলাতলী মোড় থেকে শুরু হয়ে মেরিন ড্রাইভ সড়কটি টেকনাফের শাপলা চত্বরের জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক সমুদ্রের খুব কাছ দিয়ে চলে গেছে। পুরো মেরিন ড্রাইভ ঘুরে দেখতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে।

২০১৭ সালের ৬ মে সড়কটির আনুষ্ঠানিক উদ্‌বোধন হয়। বাংলাদেশ সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

মেরিন ড্রাইভে কেন যাবেন?

মেরিন ড্রাইভের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো একই ভ্রমণে সমুদ্র, পাহাড়, ঝাউবন, ঝরনা ও প্রবাল সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ। যারা দীর্ঘ পথ গাড়িতে ঘুরে প্রকৃতি দেখতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি হতে পারে আদর্শ গন্তব্য।

বিশেষ করে বিকেলের দিকে ইনানী সৈকতে পৌঁছাতে পারলে সমুদ্রের ওপর সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ মিলবে। সময় কম থাকলে পুরো সড়ক না ঘুরে হিমছড়ি বা ইনানী পর্যন্ত গিয়েও ফিরে আসা যায়।

ঢাকা থেকে মেরিন ড্রাইভ যাওয়ার উপায়

ঢাকা থেকে বাসে কক্সবাজার যেতে সাধারণত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লাগে। ফকিরাপুল, কলাবাগান, কল্যাণপুর, গাবতলী ও যাত্রাবাড়ী থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাস পাওয়া যায়। শ্রেণিভেদে ভাড়া প্রায় ৯০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা।
ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর বা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে কক্সবাজারগামী ট্রেনে উঠতে পারেন। সিটের ধরন অনুযায়ী ভাড়া প্রায় ৬৯৫ থেকে ২ হাজার ৩৮০ টাকা। সময় লাগে প্রায় ৯ ঘণ্টা।
সময় বাঁচাতে চাইলে ঢাকা থেকে বিমানে সরাসরি কক্সবাজার যাওয়া যায়। এতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে।
কক্সবাজার পৌঁছে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে চান্দের গাড়ি, ট্যুরিস্ট জিপ, খোলা জিপ বা মাইক্রোবাস ভাড়া করা যায়। একটি গাড়িতে সাধারণত ১০ থেকে ১২ জন যেতে পারেন। মৌসুমভেদে একটি চান্দের গাড়ির ভাড়া প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা হতে পারে।

এছাড়া স্থানীয় অটোরিকশায়ও মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখা যায়। এতে সময় কিছুটা বেশি লাগলেও খরচ তুলনামূলক কম। অটোরিকশার ধরন ও দূরত্ব অনুযায়ী একটি অটোরিকশায় পাঁচ থেকে সাতজন বসতে পারেন। ভাড়া পড়তে পারে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার টাকা।

মেরিন ড্রাইভে যা যা দেখবেন

দরিয়ানগর
কলাতলী থেকে কিছুটা এগোলেই দরিয়ানগর। এখানে সমুদ্রের পাশাপাশি পাহাড় ও পার্ক রয়েছে। দৃষ্টিনন্দন ব্রিজ থেকে সমুদ্রের সৌন্দর্য দেখা যায়। প্যারাসেলিংয়ের জন্যও জায়গাটি বেশ জনপ্রিয়। জনপ্রতি খরচ পড়তে পারে প্রায় ২ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা।

হিমছড়ি
পাহাড়, সবুজ বন আর ঝরনার কারণে হিমছড়ি মেরিন ড্রাইভের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য। বর্ষাকালে ঝরনায় পানি বেশি থাকায় এ সময় এর সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি উপভোগ করা যায়। নির্দিষ্ট টিকিট নিয়ে পাহাড়ে ট্রেকিং করে চূড়ায় উঠলে ওপর থেকে দেখা যায় সমুদ্র ও পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্য। পাহাড়ের নিচে রয়েছে একটি বার্মিজ মার্কেট, যেখানে ঘুরে দেখতে পারেন নানা ধরনের পণ্য।

ঝিনুক বাজার
মেরিন ড্রাইভের সড়কের পাশেই রয়েছে ঝিনুক বাজার। এখান থেকে বিভিন্ন ধরনের শামুক, ঝিনুক ও সামুদ্রিক উপকরণ দিয়ে তৈরি স্মারক কিনতে পারেন।

প্যাচার দ্বীপের কাঁকড়া সৈকত
হিমছড়ি থেকে কিছুটা এগিয়ে পাওয়া যাবে কাঁকড়া সৈকত। বাঁশ ও কাঠের তৈরি পথ পেরিয়ে সৈকতে যেতে হয়। চারপাশের ঝাউবন জায়গাটিকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। এখানেও প্যারাসেলিংয়ের সুযোগ রয়েছে।

সোনারপাড়া সৈকত
রেজুখাল ব্রিজ পেরিয়ে সামনে গেলেই সোনারপাড়া সৈকত। ঝাউবনে ঘেরা এই সৈকত তুলনামূলক নিরিবিলি। সমুদ্রের পাশে কিছুটা শান্ত সময় কাটাতে চাইলে জায়গাটি হতে পারে ভালো পছন্দ। এ ছাড়া রেজুখালের মোহনা বা ব্রিজের নিচে কায়াকিং করার সুযোগ রয়েছে। কায়াকিংয়ের ভাড়া সময় ও প্যাকেজভেদে পরিবর্তিত হতে পারে, তাই যাওয়ার আগে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বর্তমান ভাড়া জেনে নেয়া ভালো।

ইনানী সৈকত
মেরিন ড্রাইভের অন্যতম আকর্ষণ ইনানী সৈকত। হিমছড়ির পর প্রায় ১৫ কিলোমিটার গেলে পাওয়া যায় এই প্রবাল সৈকত। ভাটার সময় পানির নিচ থেকে প্রবাল পাথর দেখা যায়। বিকেলের সূর্যাস্ত ইনানীর সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

এখানে দেখা মিলতে পারে বিশাল সাম্পান নৌকা ও সৈকতজুড়ে ছুটে বেড়ানো লাল কাঁকড়া। প্রকৃতির এই ছোট ছোট দৃশ্যই ইনানীর ভ্রমণকে করে তুলতে পারে আরও স্মরণীয়।

জেটি ঘাট
মেরিন ড্রাইভের পথে জেটি ঘাটও হতে পারে ভ্রমণের দারুণ একটি বিরতি। এখানে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট টিকিটের ব্যবস্থা রয়েছে। টিকিট কেটে জেটি এলাকায় ঢুকে সমুদ্রের কাছাকাছি সময় কাটানোর পাশাপাশি উপকূলের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। ঢেউয়ের শব্দ, খোলা আকাশ আর চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ মিলিয়ে জায়গাটি ভ্রমণের পথে দারুণ একটি স্পট।

মিনি বান্দরবন
পাহাড় আর সবুজে ঘেরা মিনি বান্দরবন মেরিন ড্রাইভের আশপাশের অন্যতম আকর্ষণীয় জায়গা। ছোট ছোট পাহাড়ের সারি, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ আর সবুজ প্রকৃতি মিলিয়ে জায়গাটির সৌন্দর্য একেবারেই আলাদা। নিরিবিলি পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানোর পাশাপাশি এখান থেকে উপভোগ করা যায় পাহাড়ঘেরা মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য।

পাটুয়ার টেক
মেরিন ড্রাইভের আরেকটি আকর্ষণ পাটুয়ার টেক। সৈকতের শেষ প্রান্তের এই জায়গাটি বেশ সুন্দর ও নিরিবিলি। এখানে বিচ বাইকে চড়ে সমুদ্রের পাড় ধরে উপকূলীয় এলাকা ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে। একটি বাইকে সাধারণত দুজন যেতে পারেন। দূরত্ব ও সময় অনুযায়ী ভাড়া পড়তে পারে প্রায় ৪০০ থেকে ১ হাজার টাকা।

ক্যারাভানে মেরিন ড্রাইভ
মেরিন ড্রাইভ ঘোরার জন্য রয়েছে ছাদখোলা ডাবল ডেকার অ্যাকোয়াহলিক ট্যুরিস্ট ক্যারাভান। এতে সমুদ্র, পাহাড় ও বিভিন্ন সৈকত দেখার পাশাপাশি রয়েছে কিচেন, লাইব্রেরি, ওয়াই-ফাই ও ওয়াশরুমের সুবিধা।

ক্যারাভানের উপরের ডেকের টিকিট ২ হাজার ২৯৯ টাকা এবং নিচের ডেকের ২ হাজার ৯৯ টাকা। ৩ থেকে ৭ বছর বয়সী শিশুদের জন্য টিকিট ১ হাজার ৫৯৯ টাকা। বিভিন্ন প্যাকেজে খাবারের ব্যবস্থাও থাকে।

মেরিন ড্রাইভ ঘুরতে যাওয়ার সেরা সময়
মেরিন ড্রাইভ ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক সময় ডিসেম্বর ও জানুয়ারি। এ সময় আবহাওয়া ভালো থাকায় পর্যটকের ভিড়ও বেশি থাকে। ফলে হোটেল, খাবার ও পরিবহনের খরচ তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

কম ভিড় ও তুলনামূলক কম খরচে ঘুরতে চাইলে নভেম্বরের শেষ ভাগ কিংবা মার্চের শুরু বেছে নিতে পারেন। এপ্রিল থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে পর্যটক কম থাকলেও বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি।

মেরিন ড্রাইভে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা
কক্সবাজার ও মেরিন ড্রাইভের আশপাশে বিভিন্ন মানের হোটেল, মোটেল ও কটেজ রয়েছে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে গেলে আগে থেকেই হোটেল বুক করা ভালো। সৈকত ও মূল সড়ক থেকে কিছুটা দূরে গেলে তুলনামূলক কম খরচে থাকার ব্যবস্থা পাওয়া যায়।

মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন পয়েন্টে রয়েছে রেস্তোরাঁ। গাড়ি থামিয়ে স্থানীয় খাবার খাওয়া এবং সমুদ্রের পাশে কিছুটা সময় কাটানো ভ্রমণের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

ভ্রমণে যা যা খেয়াল রাখবেন
জাতীয় পরিচয়পত্র বা প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন।
মেরিন ড্রাইভের নিরাপত্তা চেকপোস্টে দায়িত্বশীলদের সহযোগিতা করুন।
গাড়িতে ওঠার আগে চালকের লাইসেন্স ও গাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।
পাহাড়ি পথে অতিরিক্ত গতির গাড়ি এড়িয়ে চলুন।
পর্যাপ্ত পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম সঙ্গে রাখুন।
হুটহাট সমুদ্রে নামবেন না। জোয়ার-ভাটার সময় ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে সমুদ্রে নামুন।
সমুদ্রে নামার সময় প্রত্যেকে লাইফগার্ডের নির্দেশনা মেনে চলুন এবং সম্ভব হলে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করুন।
সমুদ্রের গভীর বা বেশি দূরের অংশে যাবেন না। নির্ধারিত নিরাপদ এলাকার মধ্যেই থাকুন।
হাঁটার উপযোগী এবং দ্রুত শুকিয়ে যায়— এমন জুতা পরুন।
ভেজা পোশাক বদলানোর জন্য অতিরিক্ত এক জোড়া কাপড় সঙ্গে রাখুন।
খোলা আকাশের নিচে ঘোরার জন্য সানস্ক্রিন, ছাতা ও সানগ্লাস সঙ্গে রাখুন।
সৈকত, পাহাড় ও সড়কের পাশে ময়লা-আবর্জনা ফেলবেন না।
স্থানীয় মানুষ, সংস্কৃতি ও পরিবেশের প্রতি সম্মান দেখান।

সমুদ্রের নীল, পাহাড়ের সবুজ আর বিকেলের সোনালি আলো— সবকিছু একসঙ্গে উপভোগ করতে চাইলে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ হতে পারে আপনার পরবর্তী ভ্রমণের ঠিকানা। একদিনের পথ হলেও এর স্মৃতি থেকে যেতে পারে অনেকদিন।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..