সম্প্রতি প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, আয়কর ও স্থানীয় পর্যায়ের মূল্য সংযোজন কর আদায়ে ঘাটতির কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রায় ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতির মুখে রয়েছে। অন্যদিকে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পাঁচ মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে বিষয় দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনে হলেও আমি এ দুটির মধ্যে একটি গভীর কাঠামোগত সম্পর্ক খুঁজে পাই।
আমার মতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কখনোই শুধু ধনী ব্যক্তি কিংবা ক্ষুদ্র পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক মানুষের ওপর কর ও মূল্য সংযোজন করের চাপ বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতির বড় অংশ আনুষ্ঠানিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে না আসে। আর এ ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজার বা পুঁজিবাজার দীর্ঘদিনে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে ভয় পান। অন্যদিকে, যাদের হাতে তুলনামূলক বেশি অর্থ রয়েছে, তাদের অনেকেই অধিক মুনাফার আশায় নিম্নমানের বা দুর্বল কোম্পানির শেয়ার কিনে প্রতারিত হয়েছেন কিংবা বড় অঙ্কের অর্থ হারিয়েছেন। ফলে আমাদের পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ সৃষ্টির ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের কার্যকর কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি; বরং অনেকের কাছে এটি একটি ফটকাভিত্তিক বাজারে পরিণত হয়েছে।
বড় সরকারি প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজার
বাংলাদেশের অনেক বড় সরকারি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আনার সুযোগ ছিল এবং এখনও রয়েছে। কিন্তু সুশাসনের অভাব, অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা এবং ক্ষেত্রবিশেষে দুর্নীতির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনুযায়ী পরিচালিত হতে পারেনি।
যেমন ধরা যাক, বাংলাদেশ রেলওয়ে বা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মতো প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার আগে অবশ্যই তাদের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন প্রয়োজন। কারণ শুধু শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করলেই কোনো লোকসানি প্রতিষ্ঠান লাভজনক হয়ে যাবে না। তবে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা নিশ্চিত করে এসব প্রতিষ্ঠানের উপযুক্ত অংশ বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে পুঁজিবাজারের আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে।
এখানে তিতাস গ্যাসের উদাহরণও গুরুত্বপূর্ণ। কোম্পানিটি দীর্ঘ সময় লাভজনক থাকার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। তা সত্ত্বেও শেয়ারধারীরা লভ্যাংশ পেয়েছেন। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লভ্যাংশ দেওয়া মানেই কোম্পানির বর্তমান কার্যক্রমভিত্তিক আর্থিক ফল ভালো, এমনটি সবসময় বলা যায় না। প্রযোজ্য আইন, হিসাববিধি এবং কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতার শর্তসাপেক্ষে পূর্ববর্তী বছরের সঞ্চিত মুনাফা বা বিতরণযোগ্য সঞ্চিতি থেকেও লভ্যাংশ দেওয়া সম্ভব। তাই শুধু লভ্যাংশ দেখেই কোনো প্রতিষ্ঠানের বর্তমান আর্থিক স্বাস্থ্য বিচার করা উচিত নয়।
পুরো প্রতিষ্ঠান নয়, প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়নও হতে পারে
এবার বাংলাদেশ রেলওয়ে ও বিমান বাংলাদেশের কথায় আসা যাক। হয়তো এই মুহূর্তে প্রতিষ্ঠান দুটি সামগ্রিকভাবে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে লাভজনক নয়। কিন্তু তাদের প্রতিটি প্রকল্প বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম অলাভজনক, এমনটি বলা যাবে না। দক্ষ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিভিন্ন নির্দিষ্ট প্রকল্প লাভজনক হতে পারে।
যেমন, একটি নতুন রেলপথ, নতুন রেললাইন, রেলগাড়ি বা নির্দিষ্ট রুটভিত্তিক বিমান পরিচালনার জন্য আলাদা অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। এ ধরনের প্রকল্পের সম্ভাব্য আয় ও ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে প্রকল্পভিত্তিক বন্ড, অবকাঠামো বন্ড বা অন্যান্য উপযুক্ত পুঁজিবাজারভিত্তিক উপকরণের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি —বন্ডের বিনিয়োগকারীরা সাধারণত লভ্যাংশ পান না; তারা বন্ডের শর্ত অনুযায়ী সুদ বা নির্ধারিত মুনাফা পান এবং মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত পাওয়ার অধিকারী হন। অন্যদিকে শেয়ারে বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠানের মালিকানার অংশীদার হিসেবে মুনাফার ভিত্তিতে লভ্যাংশ পেতে পারেন। তাই প্রকল্পের প্রকৃতি অনুযায়ী বন্ড, শেয়ার বা উভয়ের সমন্বয়ে অর্থায়নের কাঠামো নির্ধারণ করা যেতে পারে।
বড় কোম্পানিগুলো কেন পুঁজিবাজারে আসে না?
বাংলাদেশের অনেক বড় সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসে না। এর পেছনে দুর্নীতি, কর ও মূল্য সংযোজন কর ফাঁকিসহ অনানুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসা পরিচালনার প্রবণতা একটি কারণ হতে পারে। পাশাপাশি অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতার অভাব এবং মালিকানা ও আর্থিক তথ্য প্রকাশের অনীহাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
একটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে তুলনামূলক বেশি তথ্য প্রকাশ, নিরীক্ষা, সুশাসন ও নিয়ন্ত্রক বিধিবিধান মেনে চলতে হয়। ফলে কোম্পানির আয়, সম্পদ, মালিকানা এবং আর্থিক কার্যক্রম অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়। এ কারণেই শক্তিশালী পুঁজিবাজার শুধু বিনিয়োগের ক্ষেত্র নয়, বরং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতি সম্প্রসারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
দক্ষতা ও সুশাসনের অভাবে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপরও পড়ে। প্রতিষ্ঠানের আয় ও উৎপাদনশীলতা না বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে কর্মীদের বেতন-ভাতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাণিজ্যিক ব্যাংকিং আছে, কিন্তু বিনিয়োগ ব্যাংকিং কতটা শক্তিশালী?
বাংলাদেশে প্রচুর দক্ষ বাণিজ্যিক ব্যাংকার রয়েছেন। কিন্তু বড় প্রকল্পের অর্থায়ন কাঠামো তৈরি, কোম্পানিবিষয়ক পরামর্শ, শেয়ার ও বন্ড বিক্রির দায় গ্রহণ, কোম্পানি একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিশালী বিনিয়োগ ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি বিনিয়োগ ব্যাংকিং, শেয়ার ও বন্ড ব্যবসা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, কোম্পানি একীভূতকরণ ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের আর্থিক সক্ষমতা অনেক দেশের ব্যাংকের তুলনায় অত্যন্ত বড়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের আর্থিক খাতে কেন ধীরে ধীরে এ ধরনের সক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষায়িত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে না?
আমাদের প্রয়োজন শুধু আরও বেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক নয়; বরং এমন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যারা বড় অবকাঠামো প্রকল্প, কোম্পানি পুনর্গঠন, বন্ড ইস্যু এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য দক্ষতার সঙ্গে মূলধন সংগ্রহ করতে পারবে।
ব্যাংক পুনর্গঠন, সরকারি সহায়তা ও মূল্যস্ফীতির প্রশ্ন
বর্তমানে দুর্বল ইসলামী ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতার জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আর্থিক সহায়তা এবং বিভিন্ন ধরনের পুনঃমূলধনীকরণ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এ ধরনের ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের দায় বা সরকারি ঋণপত্র ব্যবহারের প্রকৃতি, অর্থায়নের উৎস এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে একটি বিষয় সতর্কতার সঙ্গে দেখতে হবে, সরকারি ঋণপত্র নিজেই কোনো অকার্যকর বা মূল্যহীন দলিল নয় এবং এটি সম্পদভিত্তিক ঋণপত্র হওয়ারও প্রয়োজন নেই; সরকারি ঋণপত্র মূলত সরকারের সার্বভৌম দায়ের ভিত্তিতে ইস্যুকৃত ঋণপত্র। তবে সরকার যদি ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে এবং সেই অর্থায়ন শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ বা চাহিদার চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে পরিস্থিতিভেদে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ পড়তে পারে।
একইভাবে, কোনো ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাৎ বা বিদেশে পাচার হওয়ার কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতি পূরণে নতুন সরকারি অর্থ ব্যবহার করা হলে সেটি অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করে। কিন্তু এটিকে সরাসরি একই টাকা বাজারে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বলা সব ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে সঠিক নয়। বিষয়টি নির্ভর করবে সরকার কীভাবে অর্থায়ন করছে, আমানতের দায় কীভাবে পুনর্গঠন হচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা সরবরাহ ও তারল্য কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে তার ওপর।
তবে মূল প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ — দুর্নীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হয়। ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাবে সৃষ্ট ক্ষতি পুনরুদ্ধারে যখন রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করতে হয়, তখন তার বিকল্প ব্যবহারের সুযোগ থেকে পুরো অর্থনীতি বঞ্চিত হয়।
শক্তিশালী বন্ড বাজার কি বিকল্প হতে পারত?
একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য পুঁজিবাজার থাকলে ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের জন্য বন্ড বাজারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের সুযোগ বাড়ত। তবে দুর্বল বা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংককে পুনঃমূলধনীকরণের জন্য উচ্চঝুঁকির বন্ড ইস্যু করলেই সমস্যা সমাধান হয়ে যেত, এমনটি বলাও ঠিক নয়।
কারণ উচ্চঝুঁকির বন্ডে ঝুঁকি বেশি হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা সাধারণত বেশি মুনাফা দাবি করেন। দুর্বল প্রতিষ্ঠানের জন্য এ ধরনের বন্ড ইস্যুতে বিশ্বাসযোগ্য পুনর্গঠন পরিকল্পনা, সুশাসন, যথাযথ ঋণমান নির্ধারণ এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা অপরিহার্য। তাই শক্তিশালী পুঁজিবাজার থাকলে বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতো, কিন্তু তার জন্যও সুশাসন ও বিশ্বাসযোগ্যতা অপরিহার্য।
একটি ভালো বন্ড বাজার ও পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে প্রবাহিত করতে পারে। তবে শুধু শক্তিশালী পুঁজিবাজার থাকলেই মূল্যস্ফীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকবে বা ব্যাংক ঋণের সুদের হার ৩ থেকে ৪ শতাংশে নেমে আসবে, এমন কোনো সরাসরি সম্পর্কও আবার নেই। মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার নির্ভর করে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, উৎপাদনশীলতা, বিনিময় হার, পণ্য সরবরাহ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভূমিকা কী হতে পারে?
একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ, অর্থাৎ সুশাসনসংবলিত শেয়ারবাজার শুধু বিনিয়োগের জায়গা নয়; বরং এটি অর্থনীতির সম্পদ, আয়, মালিকানা ও লেনদেনকে আরও আনুষ্ঠানিক, শক্তিশালী ও দৃশ্যমান করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
তাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের করযোগ্য আয় ও সম্পদের আওতা বাড়ানোর জন্য শুধু ক্ষুদ্র পর্যায়ের মানুষ ও ছোট ব্যবসার ওপর কর বা মূল্য সংযোজন করের চাপ বাড়ানোর চিন্তা না করে, বৃহৎ ও উপযুক্ত সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতি এবং পুঁজিবাজারের আওতায় আনতে নীতিগত ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
এখানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সরাসরি দায়িত্ব কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা নয়। কিন্তু করনীতি ও কর-সুবিধার মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তিকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য যৌক্তিক কর সুবিধা এবং অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির তুলনায় একটি সুস্পষ্ট নীতিগত পার্থক্য অনেক প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত করতে পারে।
এর ফলে একদিকে কোম্পানির আয়, সম্পদ ও লেনদেন আরও বেশি আনুষ্ঠানিক ও স্বচ্ছ কাঠামোর মধ্যে আসবে; অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের করের ভিত্তি সম্প্রসারণের সুযোগও বাড়বে।
সুশাসন ও সমন্বয়ই মূল কথা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমরা দেখতে পাই, সুশাসন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক ও প্রতিযোগিতামূলক করা সম্ভব। একইভাবে করের হার কমিয়েও অনেক ক্ষেত্রে কর পরিপালন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো যায়, যদি কর প্রশাসন, ব্যবসার পরিবেশ এবং কর পরিশোধের ব্যবস্থা কার্যকর হয়।
অর্থনীতিতে আসলে দুই-একটি সূত্র প্রয়োগ করে কোনো দেশের চিত্র বদলানো যায় না। শুধু করের হার বাড়ালেই রাজস্ব বাড়বে না, শুধু নতুন বন্ড ইস্যু করলেই অর্থায়ন সমস্যার সমাধান হবে না, আবার শুধু কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করলেই সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না।
"দরকার একটি সমন্বিত কাঠামো — সুশাসন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা, কার্যকর কর প্রশাসন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাস্তব সমন্বয়"।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব ঘাটতি এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের দুর্বলতা তাই হয়তো একই সমস্যার সরাসরি ফল নয়, কিন্তু উভয়ের পেছনে একটি সাধারণ প্রশ্ন রয়েছে, সেটা হচ্ছে: বাংলাদেশ কি তার অর্থনীতি, ব্যবসা, সম্পদ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথেষ্ট স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে আনতে পেরেছে?
যতদিন না এই কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়িত হচ্ছে, ততদিন শুধু ক্ষুদ্র করদাতার ওপর চাপ বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব পাওয়া কঠিন হবে। একই সঙ্গে দেশের বিপুল সঞ্চয় থাকা সত্ত্বেও পুঁজিবাজারও দীর্ঘমেয়াদি ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের প্রকৃত কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারবে না।
এ জাতীয় আরো খবর..