নেশায় বাধা দেওয়ায় শেষ হয়ে গেল একটি পরিবার

আটক দুজনের স্বীকারোক্তি

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-২৩, | ১৪:৫১:৫২ |
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় নতুন তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, নেশা করতে বাধা দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় আটক দুজন জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

রবিবার দুপুরে রংপুর কোতোয়ালি থানায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের।

আটক দুজন হলেন মুগ্ধ দাস (২৫) ও সিদ্ধার্থ দাস (২৮)। তারা একই এলাকার বাসিন্দা।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে উঠে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ নেশা করছিলেন। বিষয়টি টের পেয়ে গণপতি ছাদে গিয়ে তাদের নেশা করতে নিষেধ করেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ওই দুজন শিক্ষকের ঘরে ঢুকে তাকে ও পরিবারের সদস্যদের গালিগালাজ করেন। পরে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করে বিভিন্ন মালামাল নিয়ে তারা চলে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ওসি নাজমুল কাদের বলেন, আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এর আগে শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে রংপুর নগরের কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি ভবন থেকে গণপতি চক্রবর্তী (অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাদের দুই সন্তান আগামী চক্রবর্তী ও আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

পুলিশ ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভবনটির দ্বিতীয় তলায় পরিবারের চার সদস্য বসবাস করতেন। প্রথম ও তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ চলছিল।

পুলিশ ওই ভবনে ঢুকে প্রথমে একটি শোবার ঘরের খাটের ফাঁকে আয়ুশের মরদেহ দেখতে পায়। তার গলায় কাপড় প্যাঁচানো ছিল। এরপর তৃতীয় তলায় ওঠার সিঁড়িতে প্রীতিলতা ও তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায়। তাদের দুজনের গলায় দড়ি প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলার ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ। তার গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, শ্বাসরোধ করে চারজনকে হত্যা করা হয়েছে। চারজনের মুখ কিছুটা ঝলসানো অবস্থায় ছিল বলে জানিয়েছে সিআইডি। তাদের মুখে রাসায়নিকজাতীয় কোনো পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রংপুর সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী বলেন, হত্যাকারীরা ঘরের ভেতরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে চারজনকে হত্যা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডাকাতির উদ্দেশ্যে দুর্বৃত্তরা বাসায় ঢুকে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ কী, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।

নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ২৬ মিনিটে বড় বোন প্রীতিলতা ও ভাগনি আগামী চক্রবর্তীর সঙ্গে তার কথা হয়। প্রায় ৯ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড কথা বলার পর তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। রাত ২টা ৪০ মিনিটের দিকে প্রীতিলতার মুঠোফোন থেকে তার কাছে একটি কল আসে। ঘুমিয়ে থাকায় তিনি কলটি ধরতে পারেননি।

এরপর শুক্রবার বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগনির মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও সাড়া পাননি পূজা। বিকেলের পর সব কটি ফোন বন্ধ পাওয়া গেলে তার সন্দেহ হয়। রাত পৌনে ৯টার দিকে তিনি নগরের ফায়ার সার্ভিস এলাকার বাসা থেকে বোনের বাড়িতে যান।

বাড়ির মূল ফটকে তালা দেখে তিনি কলিং বেল চাপেন। ভেতর থেকে কেউ সাড়া না দেওয়ায় পাশের ভবনের দিক দিয়ে জানালার কাছে যান। থাই গ্লাসের লক ভেঙে ভেতরে আলো ফেললে একটি ঘরের জিনিসপত্র তছনছ অবস্থায় দেখতে পান। পরে পুলিশকে খবর দেন তিনি।

পুলিশ পাশের ভবন দিয়ে ওই বাড়িতে প্রবেশ করে প্রথমে একটি ঘরের খাটের ফাঁক থেকে আয়ুশের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে সিঁড়িতে মা-মেয়ের এবং তৃতীয় তলার ছাদে গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায়।

পুলিশ জানায়, ভবনের তিনটি কক্ষের আলমারি ও ড্রয়ার খোলা ছিল। কাপড়চোপড়, খেলনা ও অন্যান্য জিনিসপত্র মেঝে ও বিছানায় ছড়ানো ছিল। তবে কোনো আলমারি বা ড্রয়ার ভাঙা হয়নি। চাবি দিয়েই সেগুলো খোলা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু চাবির গোছাও উদ্ধার করা হয়েছে।

তবে ঘরে থাকা টেলিভিশন, ল্যাপটপ ও মুঠোফোন নেয়নি দুর্বৃত্তরা। আলমারি ও ড্রয়ারে টাকা বা গয়না ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।

নিহত আগামী চক্রবর্তী রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর করেছিলেন। তার ভাই আয়ুশ চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..