✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১২, | ১৩:৩৫:৫৯ |চতুর্থ অভিযানে বেরিয়ে মারাত্মক সংকটে পড়েছিলেন প্রখ্যাত পর্তুগিজ নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস। ১৫০৪ সালের সূচনায় জাহাজের ত্রুটির কারণে তিনি ও তার নাবিকদল আটকা পড়েন জ্যামাইকা দ্বীপে। ক্যারিবীয় সাগরের এই ভূখণ্ডটিতে তখন স্থানীয় তাইনো উপজাতির সাথে খাদ্য বিনিময়ের মাধ্যমে কোনোমতে দিন কাটছিল তাদের।
ইউরোপীয় টুকিটাকি জিনিসপত্র আর যন্ত্রপাতির বিনিময়ে আদিবাসীরা খাবার যোগান দিচ্ছিল ঠিকই কিন্তু সময় যত গড়াতে থাকে, পরিস্থিতি ততটাই জটিল হতে শুরু করে। দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা, খাদ্য সংকট এবং কলম্বাসের নিজস্ব দলবলের ভেতর থেকে উঁকি দেওয়া বিদ্রোহ জ্যামাইকাবাসীদের ধৈর্যচ্যুতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে বাধ্য হয়েই তারা ইউরোপীয়দের খাদ্য সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তীব্র অনাহার এবং চরম মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যান কলম্বাস ও তার সঙ্গীরা।
এমন এক জীবন-মরণ পরিস্থিতিতে উদ্ধারকারী জাহাজের আশা ছেড়ে দিয়ে কলম্বাস আশ্রয় নেন তার বিজ্ঞানের জ্ঞানের ওপর। তিনি শরণাপন্ন হন তার সাথে থাকা বিশেষ একটি জ্যোতির্বিজ্ঞান তালিকার, যা তৎকালীন বিখ্যাত জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইয়োহান মুলার বা ‘রেজিওমন্টানাস’ কর্তৃক প্রণীত 'আলমানাক পেরপেতুয়াম' নামে পরিচিত ছিল।
নথিপত্র ঘেঁটে কলম্বাস জানতে পারেন যে, তৎকালীন হিসাব অনুযায়ী ১৫০৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে জ্যামাইকার আকাশ থেকে একটি পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ স্পষ্ট দেখা যাবে। তৎকালীন আকাশে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের আলোর প্রতিফলনের কারণে চাঁদ স্বাভাবিক আলো হারিয়ে রক্তিম লাল বর্ণ ধারণ করে, যা ‘ব্লাড মুন’ নামেও পরিচিত।
বিজ্ঞানের এই পূর্বাভাসকে জ্যামাইকার অধিবাসীদের মনস্তত্ত্ব জয়ের একটি চাল হিসেবে ব্যবহার করেন কলম্বাস। গ্রহণের ঠিক তিন দিন আগে তিনি স্থানীয় আদিবাসী নেতাদের ডেকে পাঠান। গম্ভীর মুখে তিনি তাদের জানান যে, তার খ্রিস্টান ঈশ্বর তাইনোদের এই আচরণে অত্যন্ত রুষ্ট হয়েছেন। খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় স্বর্গীয় ঈশ্বর তাদের শাস্তি দিতে চলেছেন এবং তার ক্রোধের নিদর্শনস্বরূপ আজ রাতেই আকাশের চাঁদ উধাও হয়ে যাবে ও রক্তের মতো লাল রঙ ধারণ করবে।
নির্ধারিত রাতের অন্ধকার ঘনীভূত হতেই কলম্বাসের ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। চাঁদের স্বাভাবিক আলো ঢাকা পড়ে ধীরে ধীরে তা গাঢ় লাল রঙের রক্তিম রূপ ধারণ করে। আকাশমণ্ডলের এই অলৌকিক ও ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে জ্যামাইকার আদিবাসীরা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা নিশ্চিত বিশ্বাস করে বসে যে এটি তাদের ওপর নেমে আসা স্বর্গীয় অভিশাপ। ভীত-সন্ত্রস্ত তাইনোরা কলম্বাসের পায়ে পড়ে ঈশ্বরের কাছে তাদের ক্ষমা চাওয়ার করুণ আকুতি জানায়, যাতে তিনি এই গজব তুলে নেন।
ইতিহাস এবং কলম্বাসের পুত্র হার্নান্দোর আত্মজীবনীমূলক নথি অনুযায়ী, চতুর কলম্বাস তৎক্ষণাৎ কোনো সিদ্ধান্ত না জানিয়ে নিজেকে তার কক্ষে গুটিয়ে নেন এবং জানান যে তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় বসছেন। ভেতরে বসে তিনি সূক্ষ্মভাবে গ্রহণের শেষ হওয়ার সময় হিসেব করতে থাকেন। ঠিক যে মুহূর্তে গ্রহণ কাটতে শুরু করবে, তার কিছুক্ষণ আগেই কলম্বাস বাইরে বেরিয়ে এসে আদিবাসীদের সামনে উপস্থিত হন। তিনি ঘোষণা করেন, তার ঈশ্বর তাদের প্রার্থনায় সাড়া দিয়েছেন এবং যদি তারা আবার খাবার সরবরাহ শুরু করে, তবে ঈশ্বর তাদের ক্ষমা করবেন।
মুহূর্তের মধ্যেই আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করে এবং চাঁদ তার স্বাভাবিক আলো ফিরে পায়। এই ঘটনায় জ্যামাইকার আদিবাসীরা কলম্বাসের অলৌকিক ক্ষমতায় পুরোপুরি আশ্বস্ত হয় এবং সানন্দে তাদের রসদ যোগান দিতে রাজি হয়। সেই খাবারের ওপর নির্ভর করেই তারা বেশ কিছু মাস বেঁচে ছিলেন। এরপর একটি উদ্ধারকারী জাহাজ তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
সূত্র: ইউরো নিউজ