✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-০৩, | ১৩:৫৭:৫৯ |চিলির উপকূল থেকে শত শত মাইল দূরে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে এক নির্জন দ্বীপ। নাম রবিনসন ক্রুসো। এই দ্বীপের এক দুর্গম খাড়া পাহাড়ের গায়ে ঝুলে আছে প্রায় ১৫০ বছরের একটি বিরল গাছ। এর নাম ডেনড্রোসেরিস নেরিফোলিয়া (Dendroseris neriifolia)। এটিই বর্তমানে পৃথিবীতে প্রজাতিটির টিকে থাকা একমাত্র বন্য গাছ। তীব্র ঝড় বা ভূমিধসে যেকোনো সময় এটি পাহাড় থেকে খসে পড়তে পারে। সেজন্য গাছটিকে স্থিতিশীল রাখতে বিজ্ঞানীরা বিশেষ ফিতা ও সাপোর্টের মাধ্যমে পাহাড়ের পাথরের সঙ্গে বেঁধে রেখেছেন।
আক্ষরিক অর্থে ওই সুতোয় ঝুলছে একটি পুরো উদ্ভিদ প্রজাতির ভবিষ্যৎ। কারণ, এই শেষ বন্য গাছটি হারিয়ে গেলে ডেনড্রোসেরিস নেরিফোলিয়া প্রজাতি প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। একই সঙ্গে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে এই গাছের ফুলের ওপর আংশিকভাবে নির্ভরশীল মহাবিপন্ন স্থানীয় একটি হামিংবার্ড ‘হুয়ান ফার্নান্দেজ ফায়ারক্রাউন’। একটি দ্বীপের অনন্য বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় তাই বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা চালাচ্ছেন এক ব্যতিক্রমী সংরক্ষণ অভিযান।
ডেনড্রোসেরিস নেরিফোলিয়াকে রক্ষায় সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা গাছটি থেকে ৪০০টি বীজ সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে ২৯টি বীজ সুস্থ ও জীবিত বলে বিবেচিত হয়। পরে সেগুলো যুক্তরাজ্যের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনস, কিউতে পাঠানো হয়েছে।
গবেষকেরা জানান, দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় টিকে থাকা এবং জিনগত বৈচিত্র্য কমে যাওয়ায় এই প্রজাতির প্রায় ৯০ শতাংশ বীজ অঙ্কুরোদগমে সক্ষম নয়। পরীক্ষায় ২৯টি জীবিত বীজের মধ্যে আটটি অঙ্কুরিত করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি চারা কিউতে সংরক্ষণ করা হবে। বাকি তিনটি পাঠানো হবে স্কটল্যান্ডের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেন এডিনবরায়। অবশিষ্ট বীজ দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়েছে মিলেনিয়াম সিড ব্যাংকে।
হুয়ান ফার্নান্দেজ দ্বীপপুঞ্জ পৃথিবীর অন্যতম বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুচ্ছ। এখানকার প্রায় ৩৬০টি উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই পৃথিবীর আর কোথাও জন্মায় না। ডেনড্রোসেরিস গণের ১১টি প্রজাতিও শুধু এই দ্বীপপুঞ্জেই পাওয়া যায়। এসব গাছকে ‘বাঁধাকপি গাছ’ নামেও ডাকা হয়। এদের কাষ্ঠল কাণ্ডের ওপর ডেইজির মতো ফুল ফোটে, যা উদ্ভিদজগতে একটি বিরল বৈশিষ্ট্য।
একসময় রবিনসন ক্রুসো দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় ডেনড্রোসেরিস নেরিফোলিয়া জন্মাত। কিন্তু আগ্রাসী বিদেশি উদ্ভিদ, চারণপ্রাণীর ক্ষতি ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে ১৯৮০ দশকে এদের সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ৮টিতে। পরে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ২০১৭ সালের মধ্যে বন্য পরিবেশে সবগুলো গাছ মারা যায়। বর্তমানে মাত্র একটি বন্য গাছ টিকে আছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই গাছ বাঁচানো মানে কেবল একটি উদ্ভিদ রক্ষা করা নয়। মহাবিপন্ন ‘হুয়ান ফার্নান্দেজ ফায়ারক্রাউন’ হামিংবার্ড খাবারের জন্য এই ডেন্ড্রোসেরিস ফুলের ওপর খুবই নির্ভরশীল। তাই গাছটি বিলুপ্ত হলে শুধু একটি বিরল প্রজাতিই হারাবে না, দ্বীপটির পুরো বাস্তুতন্ত্রই মারাত্মক হুমকিতে পড়বে। এতে বিরল ওই হামিংবার্ডের পক্ষে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।
সূত্র: আএফএল সায়েন্স