ইয়েনের পতন ঠেকাতে কেন জাপানকে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-০৫, | ১৮:৩৯:১২ |

ডলারের বিপরীতে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের দরপতন ঠেকাতে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান যৌথভাবে বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে। ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবারের মতো ইয়েনের বিনিময় হার ডলারের বিপরীতে ১৬৩-এ নেমে যাওয়ার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। 

আন্তর্জাতিক অর্থবাজারে ডলার ও ইউরোর পর ইয়েন বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক লেনদেন হওয়া মুদ্রা হওয়ায় এর তীব্র অবমূল্যায়ন শুধু জাপানের নয়, বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্যও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ মূলত জাপানকে সাহায্য করার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আর্থিক স্বার্থ রক্ষার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।

কী ঘটেছে?
৩১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ইউরো বিক্রি করে ইয়েন কেনা শুরু করে। একই সময়ে জাপানের কর্তৃপক্ষও ব্যাপক হারে ইয়েন কিনে বাজারে সমর্থন দেয়। যৌথ এই হস্তক্ষেপের পর কয়েক দিনের মধ্যেই ইয়েনের দর কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায় এবং বুধবার প্রতি ডলারে প্রায় ১৫৭ ইয়েনে উন্নীত হয়।

জাপানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এমন সমন্বিত মুদ্রা হস্তক্ষেপ নতুন নয়। ২০১১ সালে তোহোকু ভূমিকম্প ও সুনামির পর দ্রুত শক্তিশালী হতে থাকা ইয়েনকে স্থিতিশীল করতে এবং ১৯৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের সময়ও ওয়াশিংটন টোকিওকে সহায়তা করেছিল।

মুদ্রা হস্তক্ষেপ কী?
মুদ্রা হস্তক্ষেপ বলতে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক বৈদেশিক মুদ্রা বড় আকারে কেনাবেচার মাধ্যমে নিজস্ব মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখার প্রচেষ্টাকে বোঝায়। সাধারণত কোনও দেশের মুদ্রা অতিরিক্ত দুর্বল বা অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে পড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে নেমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে।
এবারের ক্ষেত্রে লক্ষ্য ছিল ইয়েনের অতিরিক্ত পতন থামানো।

কেন এত দুর্বল হলো ইয়েন?
বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েনের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে।

১৯৯০-এর দশক থেকে জাপানের অর্থনীতি স্থবিরতার সমস্যায় ভুগছে।

প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ব্যাংক অব জাপান বহু বছর ধরে অতিনিম্ন, এমনকি ঋণাত্মক সুদের নীতি অনুসরণ করেছে।

নিম্ন সুদের হার ইয়েনের ওপর ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে নতুন চাপ তৈরি করেছে।

দুর্বল ইয়েন জাপানের রফতানি প্রতিযোগিতা বাড়ালেও এবং পর্যটক আকর্ষণে সহায়ক হলেও এর নেতিবাচক প্রভাবও স্পষ্ট। আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় জাপানি পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০২২ সাল থেকে টোকিও ইয়েনকে রক্ষায় কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানা তাকাইচিসহ ধারাবাহিক জাপানি সরকারের শিথিল রাজস্ব ও মুদ্রানীতির কারণে সেই প্রচেষ্টার বড় অংশ ক্ষুণ্ন হয়েছে।

আইএনজির গ্লোবাল হেড অব মার্কেটস ক্রিস টার্নার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, “তাকাইচি একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি, শিথিল রাজস্বনীতি, শিথিল মুদ্রানীতি ও স্থিতিশীল ইয়েন-সবই চান। কিন্তু এই নীতির মিশ্রণই ইয়েনকে দুর্বল করছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে।”

যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ কোথায়?
টোকিওভিত্তিক স্টেট স্ট্রিট ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ মাসাহিকো লু বলেন, “ওয়াশিংটন জাপানের স্বার্থে ইয়েন শক্তিশালী করতে নামেনি। তারা এমন বিশৃঙ্খল পতন ঠেকাতে চায়, যা মার্কিন ট্রেজারি বাজার, বৈশ্বিক অর্থায়ন ব্যবস্থা ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে।”

ইয়েন বিশ্বে ডলার ও ইউরোর পর সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া মুদ্রাগুলোর একটি। ফলে এর বড় ধরনের ওঠানামা আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং, বন্ডবাজার ও অর্থায়ন ব্যবস্থায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

মার্কিন ট্রেজারি বিক্রির আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের বড় উদ্বেগ জাপানের হাতে থাকা বিপুল পরিমাণ মার্কিন ট্রেজারি বন্ড। মে মাসে জাপানের ট্রেজারি ধারণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ দশমিক ১১৪ ট্রিলিয়ন ডলার।

ইয়েনের পতন অব্যাহত থাকলে জাপান নিজস্ব মুদ্রাকে সমর্থন দিতে নগদ অর্থ সংগ্রহের জন্য ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করতে পারে। বড় আকারের বিক্রি হলে মার্কিন সুদের হার বাড়তে পারে, যা ইতোমধ্যে ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের সুদ পরিশোধ ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের জাপান অর্থনীতি বিভাগের প্রধান শিগেতো নাগাই এক গবেষণা নোটে লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই হস্তক্ষেপের আর্থিক ব্যয় কম। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুর্বল ডলার পছন্দ করায় রাজনৈতিক ব্যয়ও সীমিত। সমন্বিত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে জাপানের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিত্রকে সহায়তা করছে, অন্যদিকে নিজস্ব সুদের হারের ওপর চাপও কমাচ্ছে।”

ট্রাম্প প্রশাসনের ডলার নীতি
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই অপেক্ষাকৃত দুর্বল ডলারকে মার্কিন রপ্তানির জন্য সহায়ক হিসেবে দেখে। সে কারণে ইয়েনকে কিছুটা শক্তিশালী হতে দেওয়া ওয়াশিংটনের জন্য রাজনৈতিকভাবে খুব ব্যয়বহুল নয়।

এই হস্তক্ষেপ কি সফল হবে?
অর্থনীতিবিদদের বড় অংশ মনে করেন, যৌথ হস্তক্ষেপ স্বল্পমেয়াদে ইয়েনকে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ফল টেকসই হবে না যদি জাপান মৌলিক নীতি পরিবর্তন না করে।

বর্তমানে জাপানের নীতিগত সুদের হার ১ শতাংশ, যা ১৯৯৫ সালের পর সর্বোচ্চ হলেও যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ উন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সুদের হারের এই বড় ব্যবধানই ইয়েন দুর্বল থাকার প্রধান কারণ।

মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান মনিটারি পলিসি অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী ডেরেক ট্যাং বলেন, “নিম্ন সুদের পরিবেশ পরিবর্তন না হলে এই হস্তক্ষেপ মূলত খারাপ অর্থের পেছনে আরও ভালো অর্থ ঢালার মতো।”

তার ভাষায়, “অর্থনৈতিক মৌলভিত্তির টান শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপের শক্তিকে অতিক্রম করবে। কিন্তু জাপান নিজস্ব সুদের হার বাড়াতে এখনও অনীহা দেখাচ্ছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি কিছুদিন স্থায়ী হতে পারে।”

সামনে কী?
বিশ্লেষকদের ধারণা, ইয়েনের স্থায়ী পুনরুদ্ধারের জন্য জাপানকে ধীরে ধীরে সুদের হার বাড়াতে হতে পারে। তবে সুদের হার বাড়ালে ঋণনির্ভর অর্থনীতি, সরকারি ঋণের বোঝা ও প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই টোকিও আপাতত সীমিত হস্তক্ষেপ, মৌখিক সতর্কবার্তা এবং ধীরগতির নীতিসামঞ্জস্যের পথেই এগোতে পারে।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ইয়েনের ওঠানামা আগামী মাসগুলোতেও বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নজরকাড়া বিষয় হয়ে থাকবে। সূত্র: আল-জাজিরা

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..