বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভান্ডার: রিপোর্ট

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-০৫, | ১৮:২৭:০৫ |

মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভান্ডার বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের জেরেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গোলাবারুদের মজুত উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। 

একাধিক মার্কিন সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র তার থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রায় ৮০ শতাংশ ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে ফেলেছে। একই সময়ে প্যাট্রয়িট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রায় অর্ধেক ইন্টারসেপ্টরও শেষ হয়ে গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ‘বিপজ্জনকভাবে নিম্ন’ গোলাবারুদের মজুত হিসেবে বর্ণনা করছেন। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সময় ধরে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর সক্ষমতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

যুদ্ধেই শেষ হয়ে যাচ্ছে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা
সর্বশেষ মজুত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানায়, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে যে পরিমাণ থাড ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, তার প্রায় পাঁচ ভাগের চার ভাগ ইতোমধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি প্যাট্রয়িট ইন্টারসেপ্টরেরও প্রায় অর্ধেক ব্যয় হয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) হিসাব অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আধুনিক সংস্করণের প্রায় ২,২০০টি প্যাট্রয়িট এবং ৪৫২টি থাড ক্ষেপণাস্ত্র ছিল।

ট্রাম্পের হামলা স্থগিতের পেছনেও ছিল অস্ত্র সংকট
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়টি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একাধিকবার অবহিত করেছিলেন তার জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টারা।

গত সপ্তাহান্তে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে ব্যাপক হামলার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়। সূত্রগুলোর দাবি, অস্ত্রের সীমিত মজুত, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব এবং উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর উদ্বেগ- এসব বিষয় মিলিয়েই হামলা থেকে আপাতত সরে আসেন ট্রাম্প।

এক জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান, শুক্রবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে হামলার চূড়ান্ত অনুমতিও দেওয়া হয়েছিল। তবে শনিবার মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মিত্র দেশের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্প সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।

মিত্র দেশগুলো সতর্ক করে দেয়, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরান তাদের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হানতে পারে। এরপর ট্রাম্প সাময়িকভাবে হামলা স্থগিতের নির্দেশ দেন। যদিও ভবিষ্যতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি।

উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি মার্কিন মিত্র দেশও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এসব দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা প্যাট্রয়িট ও থাড- এর ওপর নির্ভরশীল। তাদের আশঙ্কা, ইরান যদি মার্কিন হামলার জবাবে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালায়, তাহলে সীমিত মজুতের কারণে প্রতিরোধ সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

দীর্ঘপাল্লার অস্ত্রও প্রায় শেষ
সূত্রগুলোর দাবি, যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন সেনাবাহিনী তাদের প্রায় সব উচ্চ-নির্ভুলতাসম্পন্ন দীর্ঘপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র ব্যবহার করেছে।

এগুলোর মধ্যে রয়েছে এটিএসিএমএস এবং প্রেসিশন স্ট্রাইক মিসাইল।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একটি সূত্র জানায়, যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধেক টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের দাবি
তবে এসব তথ্যের সঙ্গে একমত নয় মার্কিন প্রশাসন। পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল এক বিবৃতিতে বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট যখন ও যেখানে প্রয়োজন মনে করবেন, সেখানে অভিযান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব সক্ষমতাই তাদের আছে।

তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক সফল সামরিক অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের জনগণ ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্রভান্ডার বজায় রেখেছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলিও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সব কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ ও অস্ত্র মজুত রয়েছে।

তার ভাষায়, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ দেখিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর পরিণতি কী হতে পারে। একই সঙ্গে ট্রাম্প দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও বেশি অস্ত্র উৎপাদনের নির্দেশ দিয়ে আসছেন।

চীন-রাশিয়ার সঙ্গে ভবিষ্যৎ যুদ্ধ নিয়েও শঙ্কা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান অস্ত্র সংকট শুধু ইরানকে কেন্দ্র করেই উদ্বেগ তৈরি করেনি; ভবিষ্যতে চীন, রাশিয়া কিংবা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

একটি সূত্রের ভাষ্য, পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর না থাকলে বড় আকারে ড্রোন হামলা প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে প্রচলিত সামরিক হামলাও উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।

মজুত পূরণে লাগতে পারে কয়েক বছর
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবহৃত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন হার এখনও তুলনামূলক কম।

বর্তমান উৎপাদন সূচি অনুযায়ী, প্রতি মাসে পেন্টাগন প্রায় ১৫টি নতুন টমাহক এবং ২০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছে।

সিএসআইএস-এর বিশ্লেষণ বলছে, থাড-এর মজুত যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে তিন বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।

যদিও প্রতিরক্ষা বিভাগ প্যাট্রিয়ট ও থাডের রকেট মোটর উৎপাদন বাড়াতে সম্প্রতি নতুন দুটি চুক্তি করেছে, তবুও পূর্ণ সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে কয়েক বছর সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

তাদের মতে, প্রেসিশন স্ট্রাইক মিসাইল এবং যৌথ আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য স্ট্যান্ডঅফ মিসাইল (জয়েন্ট এয়ার টু সারফেস স্ট্যান্ড অফ মিসাইল)- এর মতো কিছু অস্ত্রের মজুত তুলনামূলক দ্রুত পুনর্গঠন সম্ভব হলেও প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। সূত্র: সিএনএন

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..