স্বায়ত্তশাসন বাতিলের সাত বছর, কাশ্মীরের মুক্ত চিন্তা-রাজনীতি এখনও খাঁচাবন্দি

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-০৫, | ১৪:২৬:৩৪ |

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫-এ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর সাত বছর পার হলেও জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বিতর্ক এখনও তুঙ্গে। ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘ এক দশক পর সেখানে একটি নির্বাচিত সরকার ও আইনসভা প্রতিষ্ঠিত হলেও স্থানীয় রাজনীতি ও মুক্ত চিন্তার সুযোগ আগের চেয়ে অনেক সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকেরা। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ন্যাশনাল কনফারেন্সের ওমর আবদুল্লাহ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও এই পুনর্গঠিত কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা আগের রাজ্যের তুলনায় একেবারেই সীমিত।

রাজনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মীরকে শুধু রাজ্যের মর্যাদা থেকে বঞ্চিতই করা হয়নি বরং এখানকার স্বায়ত্তশাসন ও সাংবিধানিক সুরক্ষাবলয়ও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর নয়াদিল্লির সরাসরি শাসনের পর নির্বাচনে জনগণের বিপুল অংশগ্রহণকে কেন্দ্র সরকার 'স্বাভাবিক পরিস্থিতির প্রতীক' হিসেবে তুলে ধরলেও স্থানীয় প্রতিনিধিরা একে অন্যভাবে দেখছেন। তাদের মতে, রেকর্ড পরিমাণ ভোটদান কোনোভাবেই ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের প্রতি জনগণের সমর্থনের প্রমাণ নয় বরং এটি ছিল বিদ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ ও পরিবর্তনের তাড়নার বহিঃপ্রকাশ।

বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোয় নির্বাচিত বিধানসভার প্রশাসনিক ও শাসনতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা অনেক বেশি। ন্যাশনাল কনফারেন্স ও পিডিপির মতো আঞ্চলিক দলগুলোর দাবি, আগের মতো পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের ক্ষমতা না থাকায় জনকল্যাণ ও নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্তের চেয়ে জটিল প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতেই তাদের বেশিরভাগ শক্তি ব্যয় হচ্ছে। তার ওপর ২০২২ সালের বিতর্কিত সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিধানসভার আসন সংখ্যা বাড়িয়ে জম্মু অঞ্চলকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা মূল কাশ্মীরের রাজনৈতিক প্রভাবকে কিছুটা হ্রাস করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনীতিতে এখন এক ধরনের অদৃশ্য সেন্সরশিপ ও কঠোর নজরদারি বজায় রয়েছে। গণবিক্ষোভ, বড় আকারের রাজনৈতিক জনসভা কিংবা অধিকার আদায়ের আন্দোলনগুলো আজ প্রায় অনুপস্থিত। বিচ্ছিন্নতাবাদী বা ঐতিহ্যবাহী হুররিয়াত রাজনীতির দৃশ্যমান উপস্থিতি প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও মূলধারার রাজনীতিও এক প্রকার নতুন সীমানার মধ্যে আবদ্ধ। মানবাধিকার লঙ্ঘন, বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন বা ইউএপিএর অপব্যবহার, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি কিংবা বাকস্বাধীনতা সংক্রান্ত স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনার সুযোগ দিন দিন কমে আসছে। উদাহরণস্বরূপ, বারামুল্লা থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশীদ নির্বাচনে জয়লাভ করা সত্ত্বেও এখনও কারাগারে বন্দী রয়েছেন। এই ঘটনাকে স্থানীয় ভোটারদের গণতান্ত্রিক রায়ের প্রতি অবমাননা হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

অন্যদিকে, ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষ থেকে এই পরিবর্তনকে এক ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের দাবি, ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের ফলে অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সহিংসতার পথ বন্ধ হয়েছে এবং উন্নয়নের নতুন পথ উন্মুক্ত হয়েছে। বিজেপি মুখপাত্রদের মতে, সফল নির্বাচন পরিচালনা ও রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এসেছে এবং জনগণ মূলধারার সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে।

যাই হোক না কেন, নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি বাছাইয়ের অধিকার ফিরলেও জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের জায়গায় কতটা ক্ষমতায়িত হয়েছেন, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েই গেছে। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও সীমিত ক্ষমতার বলয়ে পরিচালিত এই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক স্থায়িত্ব আদৌ সম্ভব কিনা, সেটিই এখন কাশ্মীরের রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..