'ধেয়ে আসছিল আগুনের দেয়াল'

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-২৫, | ১৯:৪৪:৫৮ |

দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের ভয়াবহ দাবানল মুহূর্তেই শান্ত পর্যটন এলাকাগুলোকে আতঙ্কের নগরীতে পরিণত করেছে। রাতের অন্ধকারে জরুরি সতর্কবার্তা, দরজায় দরজায় নিরাপত্তা বাহিনীর তাগাদা এবং আকাশছোঁয়া আগুনের দেয়াল এড়িয়ে পালিয়ে বাঁচার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন বহু পর্যটক। একই সঙ্গে মধ্য স্পেনেও ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ায় দুই দেশ মিলিয়ে দুই লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ফ্রান্সের জনপ্রিয় পর্যটন অঞ্চল ক্যাপ ফেরে, বিসকারোস এবং আশপাশের বনাঞ্চলে দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে। প্রবল বাতাস ও তীব্র তাপপ্রবাহ আগুনকে আরও ভয়ংকর করে তুলছে। তবে এখন পর্যন্ত বোর্দো ও মাদ্রিদগামী বিমান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে পর্যটকদের আতঙ্কিত না হয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

লন্ডনের ২১ বছর বয়সী পর্যটক জ্যাক মরিসন জানান, পরিবারের ১০ সদস্যকে নিয়ে তিনি ক্যাপ ফেরেতে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভোর চারটা ও ছয়টার দিকে মোবাইলে পরপর দুটি জরুরি বার্তা আসে, যাতে দ্রুত এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবাইকে সরিয়ে নিতে শুরু করেন। মরিসনের ভাষায়, পুরো ঘটনাটি যেন কোনো দুর্যোগভিত্তিক চলচ্চিত্রের দৃশ্য। প্রথম আগুনের এলাকা থেকে সরে যাওয়ার পরও তারা আরেকটি দাবানলের মুখোমুখি হন। শেষ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা কাছের একটি সৈকতে আশ্রয় নেন এবং পরে আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে নিরাপদে থাকতে সক্ষম হন।

তিনি আরও জানান, অনেক মানুষকে স্কুল, গুদামঘর কিংবা সৈকতে রাত কাটাতে হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনি শুনেছেন, আগুনের তীব্রতায় মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই অনেক বাড়িঘর পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা এখন স্থানীয়দের কাছে প্রায় নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।

আরেক ব্রিটিশ পর্যটক ডেভিড মর্টন জানান, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে সপ্তাহব্যাপী ছুটির বেশির ভাগ সময়ই ভালো কেটেছিল। কিন্তু সফরের শেষ দিকে ভোরে মোবাইলে জরুরি সতর্কবার্তা পেয়ে মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে গাড়িতে উঠতে হয়। এলাকা ছাড়ার সময় তারা আগুনের মাত্র কয়েকশ মিটার দূর দিয়ে অতিক্রম করেন। তার বর্ণনায়, আগুনের শিখা আশপাশের সুউচ্চ পাইন গাছের চেয়েও উঁচুতে উঠে গিয়েছিল এবং তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় যে আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

বিসকারোস এলাকার বাসিন্দা এবং ফরাসি-আমেরিকান নাগরিক রেবেকা পাপিন জানান, প্রথমে দূরে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আকাশে পানি বহনকারী উড়োজাহাজ, দমকলের হেলিকপ্টার এবং দিগন্তজোড়া আগুনের দৃশ্য চোখে পড়ে। রাতে সন্তানদের নিয়ে ঘুমিয়ে থাকায় তিনি সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা শুনতে পারেননি। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন পুরো শহর প্রায় ফাঁকা। পুলিশ তাকে ঘরের ভেতরেই থাকতে পরামর্শ দেয়, কারণ আশপাশের সড়কগুলো আগুনে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তিনি জানান, আকাশ থেকে ছাই তুষারের মতো ঝরে পড়ছিল।

দাবানলের কারণে অনেক পর্যটক নির্ধারিত ছুটির পরিকল্পনা বদলে ফেলেছেন। যুক্তরাজ্যের লিডস শহরের বাসিন্দা মার্ক ডোরে জানান, একটি ক্যাম্পসাইটে পরিবারের সঙ্গে সংগীতানুষ্ঠান উপভোগ করার সময় হঠাৎ অনুষ্ঠান বন্ধ করে সবাইকে জানানো হয় যে অবিলম্বে এলাকা খালি করতে হবে। পরে তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে অন্য অঞ্চলে চলে যান। এর আগে শত শত মানুষের সঙ্গে একটি জিমনেসিয়ামে রাত কাটাতে হয়েছিল। নিরাপদে থাকতে পারলেও আগামী বছর ছুটি কাটানোর জন্য তিনি নিজের দেশের কাছাকাছি কোনো গন্তব্য বেছে নেওয়ার কথা ভাবছেন।

এদিকে ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক অংশীদারবিষয়ক মন্ত্রী এলেওনোর ক্যারো জানিয়েছেন, দেশের সব অঞ্চল দাবানলে আক্রান্ত নয়। প্যারিসসহ অধিকাংশ এলাকাই স্বাভাবিক রয়েছে। তাই পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যে এলাকায় অবস্থান করবেন, সেখানকার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সময়ে স্পেনের মাদ্রিদের উপকণ্ঠেও দাবানল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আঞ্চলিক প্রশাসন এটিকে অঞ্চলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছে। উচ্চ তাপমাত্রা, প্রবল বাতাস এবং একাধিক আগুনের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সূত্র: বিবিসি

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..