✕
ইথিওপিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ডানাকিল ডিপ্রেশনের খনিজসমৃদ্ধ হ্রদগুলো থেকে কেটে নেওয়া লবণের স্ল্যাব বহন করে নিয়ে যায় উটের দল
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-২৩, | ১৭:২৭:২৯ |মরুভূমির তীব্র খরা ও গরম সহ্য করার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য উটকে ‘মরুভূমির জাহাজ’ বলা হয়ে থাকে। তবে আফ্রিকার ক্রমবর্ধমান তীব্র তাপমাত্রা ও খরা এবার এই সহ্যক্ষমতা সম্পন্ন প্রাণীটিকেও চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আফ্রিকার সাহারা ও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে উত্তাপ এতটাই বেড়ে গেছে যে উটও তা সহ্য করতে পারছে না।
পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তপ্ত ও শুষ্ক স্থানগুলোর একটি হলো উত্তর-পূর্ব ইথিওপিয়ার আফার অঞ্চলটি। যেখানে যাযাবরেরা প্রায়শই মরুভূমির বুক চিরে লবণ বহনকারী উটের কাফেলা নিয়ে চলে।
আফারের সেমেরা শহরের ৪০ বছর বয়সী উটপালক আলী উমর বলেন, ‘আমি নিজের চোখে আমার উটগুলোকে তীব্র গরমে কষ্ট পেতে দেখছি।’
প্রায় ৫০০টি উটের মালিক এই ব্যক্তি বলেন, ‘অতিরিক্ত গরমে তাদের পায়ে ফোসকা পড়ে যায়, চোখ দিয়ে পানি পড়ে এবং তারা যখন বালুতে বসে, তখন তপ্ত বালু তাদের চামড়া পুড়িয়ে দেয় ও পশম নষ্ট করে ফেলে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত এক মাসের মধ্যে অতিরিক্ত গরমের কারণে আটটি উটের বাচ্চা হারিয়েছি। তাপমাত্রা এখন অনেক বেশি তীব্র ও সহ্যের অতীত হয়ে উঠেছে। এমনকি যে বাতাস আগে শীতল হাওয়া নিয়ে আসত, তা-ও এখন উত্তাপ বয়ে নিয়ে আসে।’
তিনি জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি তাপমাত্রার এই বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন।
কেবল তিনিই একা এমনটা দেখছেন তা নয়, বিজ্ঞানী, প্রাণী কল্যাণকর্মী এবং বিভিন্ন গবেষণাও চরম তাপমাত্রার প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে উটের শারীরিক চাপ, ক্লান্তি, পানিশূন্যতা এবং রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা উল্লেখ করেছে।
এছাড়া উচ্চ তাপমাত্রা পরোক্ষভাবে তীব্র পানি ও উদ্ভিদের সংকট তৈরি করে এবং ছায়াযুক্ত এলাকা কমিয়ে দিয়ে উটগুলোকে তীব্র দুর্ভোগের মুখে ফেলছে।
উত্তর আফ্রিকা এবং আফ্রিকার শিং (হর্ন অব আফ্রিকা) অঞ্চলে বিশ্বের মোট এক-কুঁজবিশিষ্ট (ড্রোমেডারি) উটের প্রায় ৮০ শতাংশ বসবাস করে।
বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চলের কৃষক ও পশুপালকেরা তীব্র গরম এবং খরায় উটের চমৎকার সহ্যক্ষমতার কারণে এই প্রাণীর পালনের দিকে ঝুঁকেছিলেন।
তবে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় (যেটি দক্ষিণ ইথিওপিয়ার উটপালকদের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি) দেখা গেছে, উচ্চ তাপমাত্রা এবং জলবায়ুর তারতম্য উটের পালের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে।
গবেষণায় বলা হয়, ‘অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন জলবায়ু পরিবর্তন ও এর তারতম্য উটের স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা এবং প্রজনন ক্ষমতার ক্ষতি করেছে।’
প্রতিবেশী সোমালিয়ায় পরিস্থিতি আরও বেশি সংকটজনক বলে মনে হচ্ছে। গত জুনে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, খরাসংক্রান্ত কারণে উটের মৃত্যু এক ব্যাপক সংকটে রূপ নিয়েছে, যা উটপালক পরিবারগুলোর প্রায় ৪৬ শতাংশকেই প্রভাবিত করেছে।
প্রায় ৬০০০ পশুপালক পরিবারের ওপর চালানো এই গবেষণায় দেখা গেছে, উটের মৃত্যুর ঘটনাগুলো মূলত উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে বেশি ঘটেছে। যার মধ্যে সূল অঞ্চলে মৃত্যুর হার ছিল ‘আশঙ্কাজনকভাবে প্রায় ৭৩ শতাংশ’।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অঞ্চলের খরার পেছনে প্রধান কারণ হলো চরম উত্তাপ, যদিও পর্যাপ্ত পশুচিকিৎসা ও প্রাণী ব্যবস্থাপনার অভাবের মতো অন্যান্য বিষয়গুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞানীদের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১-২২ সালের খরার পেছনে প্রধান ভূমিকা ছিল এই উচ্চ তাপমাত্রার। কারণ অতিরিক্ত উত্তাপের ফলে মাটি ও জলাশয় থেকে পানি বাষ্পীভূত হয়ে যায় এবং গাছপালাও বাষ্প আকারে বাতাস থেকে পানি ছেড়ে দেয়।
পশু চিকিৎসকেরা বলছেন, তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অসুস্থ উটের চিকিৎসা করছেন এবং অতিরিক্ত গরম ও খরার কারণে উটের মৃত্যুর ঘটনাও অনেক বেশি দেখতে পাচ্ছেন।
সূত্র: বিবিসি।