সৌদির সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি কেন ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির প্রতীক হয়ে উঠছে?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-২৩, | ১৭:০৩:২৪ |

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ‘গেম-চেঞ্জার’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও একটি উচ্চঝুঁকির কূটনৈতিক বাজি ধরেছেন। সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত নতুন বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিকে অনেক বিশ্লেষক ট্রাম্পের শাসনদর্শনের প্রতীক হিসেবে দেখছেন।

বুধবার স্বাক্ষরিত বহু বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তি শুধু একটি বাণিজ্যিক সমঝোতা নয়; এটি ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দর্শন- ‘চুক্তির মাধ্যমে কূটনীতি’- এর বাস্তব প্রতিফলন বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

তবে সমালোচকদের মতে, এই চুক্তি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দুর্বল করতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা ঘটাতে পারে এবং ইতোমধ্যেই অস্থির অঞ্চলে আরও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।

৩০ বছরের চুক্তি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা
চুক্তিটি ৩০ বছরের জন্য কার্যকর থাকবে এবং এর আওতায় সৌদি আরবকে এমন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তা করা হতে পারে, যার মাধ্যমে দেশটি ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা অর্জন করবে।

ট্রাম্প প্রশাসন এই চুক্তিকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের দাবি-
১. এটি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের সর্বোচ্চ মানদণ্ড বজায় রেখেই সম্পন্ন হয়েছে।
২. এটি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শিল্পের জন্য বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করবে।
৩. একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।

জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট ফক্স বিজনেসকে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতির মূল ভিত্তি সংঘাত নয়, বরং বাণিজ্য।”

কেন উদ্বিগ্ন সমালোচকরা?
চুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো- সৌদি আরব ভবিষ্যতে যদি উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে সেটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথও খুলে দিতে পারে।

রিয়াদ বলেছে, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা না করে, তবে সৌদি আরবও সে পথে হাঁটবে না। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি বদলে গেলে সৌদি আরবের এমন সক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা করতে পারে। সেক্ষেত্রে মিসর, তুরস্কসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিও একই ধরনের কর্মসূচি গ্রহণে উৎসাহিত হতে পারে।

আইএইএ নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের এমন একটি আইনের আওতায় সম্পন্ন হয়েছে, যা বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি স্থানান্তরের অনুমতি দেয়, তবে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ঠেকানোর শর্তও আরোপ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, এতে একটি দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সুরক্ষা চুক্তি রয়েছে।

তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবকে হয়তো আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার অ্যাডিশনাল প্রটোকল স্বাক্ষর করতে হবে না। এই প্রটোকল কার্যকর হলে আরও কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ও নজরদারির আওতায় থাকতে হয়।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি সত্যিই এমন ব্যতিক্রম করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোও আন্তর্জাতিক নিয়ম এড়িয়ে নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার দৃষ্টান্ত পেয়ে যাবে।

আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের নন-প্রলিফারেশন নীতিবিষয়ক পরিচালক কেলসি ড্যাভেনপোর্ট বলেন, “চুক্তিটি নিজেই বেপরোয়া ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও উদ্বেগজনক হতে পারে।”

অন্যদিকে সেন্টার ফর আর্মস কন্ট্রোল অ্যান্ড নন-প্রলিফারেশনের জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারণ পরিচালক জন এরাথ বলেন, আইএইএ’র পূর্ণাঙ্গ মানদণ্ড অনুসরণ না করলে সেটি ‘খুবই বড় সমস্যা’ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের উদ্দেশ্যই হলো নিশ্চিত করা যে, সৌদি আরব এমন কোনও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমে জড়াবে না, যা ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা সৃষ্টি করে।

ইরান যুদ্ধের মাঝেই নতুন সমীকরণ
চুক্তির সময়টিও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, তাদের লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা।

এই অবস্থায় সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক মহলে দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ আরও জোরালো হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এতে ইরানও একই ধরনের অধিকার দাবি করতে পারে, ফলে ভবিষ্যতে তেহরানের সঙ্গে নতুন পারমাণবিক চুক্তি করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

ট্রাম্পের কূটনীতির বৈশিষ্ট্য: প্রচলিত নিয়ম ভেঙে নতুন পথ
মধ্যপ্রাচ্যে এটি ট্রাম্পের প্রথম ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নয়। প্রথম মেয়াদেই তিনি ইরানের সঙ্গে করা আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেন। পরে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার নির্দেশ দেন। এরপর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো এবং চলতি বছর ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্তও নেন।

একইভাবে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতেও তিনি পূর্ববর্তী মার্কিন প্রশাসনগুলোর অনুসৃত দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের নীতি থেকে সরে এসে ইসরায়েলের কঠোর অবস্থানকে আরও বেশি সমর্থন দিয়েছেন।

সিরিয়ার ক্ষেত্রেও তিনি ১৯৭৯ সাল থেকে বহাল থাকা ‘সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র’ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণাটি প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছেন। সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক সংস্কার, মানবাধিকার ও সন্ত্রাসবিরোধী অঙ্গীকার নিশ্চিত না করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সৌদির সঙ্গে সম্পর্কেও ব্যতিক্রমী ট্রাম্প
পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলেও দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্নে সবসময় কিছুটা ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছেন।

কিন্তু ট্রাম্প প্রকাশ্যেই সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে তিনি উপসাগরীয় ধনী দেশগুলোকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনাময় অংশীদার হিসেবে দেখেন। সমালোচকদের দাবি, ট্রাম্প পরিবারেরও ওই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে।

সমর্থকদের যুক্তি
ট্রাম্পের সমর্থকদের মতে, কয়েক দশকের মার্কিন নীতি মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে পুরোনো কৌশল বদলে নতুন পথ অনুসরণ করাই ছিল প্রয়োজন।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সম্প্রতি বলেন, “উগ্রবাদীদের হাতে যেন কখনওই পারমাণবিক অস্ত্র না যায়, তা নিশ্চিত করতে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশংসার দাবিদার।”

দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি কি বাড়ছে?
তবে সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক ও আদর্শিক বাস্তবতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না।

তাদের মতে, ইরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়ানোর পরিণতি কী হতে পারে, হরমুজ প্রণালী বন্ধের মতো প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে কি না- এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একইভাবে সৌদি আরব বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও ভবিষ্যতে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। প্রযুক্তি একবার হস্তান্তর হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র আর তার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে না।

কেলসি ড্যাভেনপোর্টের ভাষায়, “আজ যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার, আগামীকালও যে একই অবস্থানে থাকবে- তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। প্রযুক্তি একবার হস্তান্তর হয়ে গেলে সেটির ভবিষ্যৎ ব্যবহার আর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।”

‘দেখা যাবে কী হয়’- ট্রাম্পের পরিচিত দর্শন
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই একটি বাক্য ব্যবহার করেন- “দেখা যাবে কী হয়।”

সমর্থকদের কাছে এটি সাহসী নেতৃত্বের প্রতীক হলেও সমালোচকদের মতে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মতো অস্থির অঞ্চলে এই মানসিকতা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

তাদের মতে, সৌদি আরবের সঙ্গে নতুন পারমাণবিক চুক্তি সেই অনিশ্চয়তারই সর্বশেষ উদাহরণ, যা শুধু বর্তমান নয়, আগামী কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক পারমাণবিক ভারসাম্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। সূত্র: সিএনএন

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..