শিশু মন নিয়ে তারা খেলেন, আনন্দে করেন ‍উদযাপন

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-১৯, | ২১:৫০:০৫ |

বিশ্বকাপের ফাইনাল নিশ্চিত করার গোলটি করার পর যখন ডাগআউটে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন লাউতারো মার্তিনেজ, তখন তিনি আবেগ ধরে রাখতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেই মুহূর্তে কোনো ট্রফি বা গোলের কথা নয়, তার মুখে উঠে এলো বাবার কিনে দেওয়া প্রথম জুতো আর কিশোর বয়সে যখন অন্য শহরের এক ক্লাবের হোস্টেলে থাকতেন, তখন প্রতিদিন মায়ের বিছানা গুছিয়ে দেওয়ার সেই স্মৃতি। মার্তিনেজ স্পষ্ট করেই বললেন, যেকোনো গোল বা কাপের চেয়ে এই স্মৃতিগুলোই তার কাছে সবচেয়ে বড় সম্পদ।

আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি অবশ্য সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের গোলের পর কিছুটা চিন্তিত ছিলেন, তবে নিজের শিষ্যদের ওপর বিশ্বাস হারাননি কখনোই। দলটির লড়াকু মানসিকতার প্রশংসা করে স্কালোনি বলেন, এই ফুটবলাররা এমন এক পরিবেশে বড় হয়েছে যেখানে তারা কাউকেই ভয় পেতে শেখেনি। ছোটবেলা থেকেই তারা সব প্রতিযোগিতায় সেরা হয়ে এসেছে, তাই বড় কোনো দায়িত্বের চাপ তাদের কাবু করতে পারে না। তার চোখে মাঠের খেলোয়াড়রা যেন একেকজন আট বা নয় বছরের শিশু, যারা হারের ভয় ভুলে মনের আনন্দে ফুটবল খেলে। মাঠের ভেতরে তারা বুনো, দুর্দান্ত ও অপ্রতিরোধ্য; তারা মাঠের একেকজন লড়াকু সৈনিক। তুমুল প্রত্যাশার চাপ থাকলেও টিম ম্যানেজমেন্ট সবসময়ই ফুটবলারদের মাঠের খেলাটাকে ভালোবেসে উপভোগ করার এবং বলের সাথে সেই সহজাত ও চঞ্চল সম্পর্কটা ধরে রাখার পরামর্শ দেয়।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ সাইমন কুজনেটসের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, পৃথিবীতে চার ধরনের দেশ রয়েছে; উন্নত, অনুন্নত, জাপান এবং আর্জেন্টিনা। যেকোনো বাঁধাধরা কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিজের অনন্য বৈশিষ্ট্য বজায় রাখাটা আর্জেন্টিনার মানুষের এক সহজাত চরিত্র। আজকাল একটি রসাত্মক ছবি বেশ ঘুরপাক খাচ্ছে যেখানে বলা হয়েছে, স্পেনকে তাড়ানোর আগে আর্জেন্টিনাকে প্রথম তাড়াতে হয়েছিল ব্রিটিশদের, আর ইতিহাস নাকি বারবার ফিরে আসে। শতাব্দী প্রাচীন সেই স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস আর্জেন্টিনার প্রাথমিক স্কুলেই শেখানো হয়, যা উত্তর গোলার্ধের অনেক পর্যবেক্ষকের কাছেই বেশ বিস্ময়কর মনে হতে পারে।

আর্জেন্টিনা আসলে বৈচিত্র্যময় ও উন্মুক্ত সমাজ, যেখানে বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মানুষ যুগ যুগ ধরে আশ্রয় পেয়েছে। কিন্তু সব বিভেদ ভুলে পুরো দেশকে একটি সুতোয় বেঁধে রাখার সবচেয়ে বড় মাধ্যমটি হলো ফুটবল। আর্জেন্টিনার মানুষ ফুটবলকে শিল্প হিসেবে ভালোবাসে, একে জীবনের কঠিন বাস্তবতার সুন্দর মুক্তি হিসেবে দেখে। দেশটি শস্য ও মাংসের মতোই বিশ্বজুড়ে ফুটবলার এবং ম্যানেজার রপ্তানি করে। চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও এক টুকরো খালি জায়গায় শিশুরা যেকোনো কিছু পায়ে নিয়ে ফুটবল দক্ষতা ঝালিয়ে নেয়, যা তাদের দারুণ ফুটবলার হিসেবে গড়ে তোলে। ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক দানিয়েল পাসারেলা একবার বলেছিলেন, জীবনের অন্য সব ক্ষেত্রে হয়তো আর্জেন্টিনাকে বিশ্বমঞ্চে কিছুটা খাটো করে দেখা হতে পারে কিন্তু ফুটবলে তারা যেকোনো প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে সমান মর্যাদায় দাঁড়াতে পারে।

এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ওপর নানা সমালোচনা আর বিতর্ক থাকলেও মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই সবকিছুর জবাব দিতে চায় তারা। লিওনেল মেসির জাদুতে বুঁদ হয়ে পুরো দেশ এখন ফুটবলীয় আবেগের জোয়ারে ভাসছে। কারণ ব্রাজিলিয়ান কবি সার্জিও ভাজের ভাষায়, ফুটবল শুধু দেখার বিষয় নয়, এটি অনুভবের বিষয়। 

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..