কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির প্রবৃদ্ধি দক্ষিণ কোরিয়ার সাধারণ সেমিকন্ডাক্টর কারখানাসংলগ্ন এলাকাগুলোকে রাতারাতি বিলাসবহুল শহরে পরিণত করেছে।
চিপ খাতের রেকর্ড মুনাফার পর কর্মীদের দেয়া বিশাল বোনাসের অর্থ দেশটির আবাসন খাত, বিলাসবহুল পণ্যের বাজার ও দামি গাড়ির শোরুমগুলোয় বড় পরিবর্তন এনেছে। ফলে সাধারণ শিল্প এলাকাগুলো এখন দেশটির অন্যতম শীর্ষ ধনী এলাকায় পরিণত হয়েছে। খবর এফটি।
এ অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাজধানী সিউলের পার্শ্ববতী হোয়াসেওং শহরের দংতান এলাকা। দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত ‘সেমিকন্ডাক্টর বেল্ট’-এর ঠিক মাঝখানে অবস্থিত এ দংতান এখন প্রযুক্তি খাতের নতুন ধনীদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
স্থানীয় রিয়েল এস্টেট এজেন্টরা জানান, এখানকার ফ্ল্যাটের বাজারে অভূতপূর্ব ক্রেতা তৈরি হয়েছে। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টের দাম প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার ডলার (প্রায় ২০ কোটি ওন) বেড়েছে।
দংতান স্টেশনের কাছে প্রিমিয়াম ‘লোটে ক্যাসল’ অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে ফ্ল্যাটের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরের আগে যেসব অ্যাপার্টমেন্টের দাম ছিল ১৫০ কোটি ওন, বর্তমানে সেগুলো বিক্রি হচ্ছে ২১০ কোটি ওনে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, দাম আরো বাড়ার আশায় অনেক মালিক এখন ফ্ল্যাট বিক্রি না করে ধরে রাখছেন।
ইউ চ্যাং-ওয়ান নামের এক আবাসন ব্যবসায়ী বলেন, ‘দংতান স্টেশন এলাকার অর্ধেকেরও বেশি ক্রেতা পুরো অর্থ নগদে পরিশোধ করছেন।’
তিনি জানান, ক্রেতাদের বড় অংশই স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের মতো চিপ কারখানার কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও আইনজীবী।
এদিকে প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিকস তাদের কর্মীদের কম সুদে ৫০ কোটি ওন পর্যন্ত গৃহঋণ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ পদক্ষেপ আবাসন বাজারকে আরো চাঙ্গা করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিশাল অর্থপ্রবাহের পেছনে মূল কারণ বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির আকস্মিক জোয়ার। স্যামসাং ইলেকট্রনিকস এবং প্রতিদ্বন্দ্বী এসকে হাইনিক্স মিলে বিশ্বজুড়ে এআই সার্ভারে ব্যবহৃত উন্নত মেমোরি চিপের বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে।
ব্যবসায় ব্যাপক সাফল্যের পর দুটি কোম্পানিই কর্মীদের বড় অংকের আর্থিক পুরস্কার দিয়েছে। মেমোরি চিপ বিভাগের একজন সাধারণ কর্মীও বছরে গড়ে প্রায় ৬০ কোটি ওন বোনাস পেয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় একজন মানুষের গড় বার্ষিক আয় যেখানে প্রায় ৫ কোটি ওন, সেখানে চিপ খাতের কর্মীদের এ বোনাস দেশের গড় আয়ের চেয়ে ১২ গুণেরও বেশি। এ বাড়তি আয়ের কারণে প্রযুক্তি কর্মীদের ক্রয়ক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে।
স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়ও এ ধনীদের প্রভাব স্পষ্ট। দংতানের বিলাসবহুল ‘লোটে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর’-এর কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে তাদের মোট বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে নামি ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল পণ্যের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
একই চিত্র দেখা গেছে এসকে হাইনিক্সের মূল কেন্দ্র ইচিয়ন শহরেও। হুন্দাই বা কিয়ার মতো সাধারণ কোরিয়ান ব্র্যান্ডের চেয়ে কয়েক গুণ দামি বিদেশী বিলাসবহুল গাড়ি নিবন্ধনের হার এক বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণ হয়েছে।
চিপ খাতের এ সাফল্য শুধু ব্যক্তিদের ভাগ্যই নয়, বরং স্থানীয় সরকারের রাজস্ব আয়ও অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। হোয়াসেওং এলাকার সংসদ সদস্য লি জুন-সিওক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, এ বছর শুধু স্যামসাং থেকেই শহর কর্তৃপক্ষ প্রায় ১ লাখ কোটি ওন কর আশা করছে।
তবে চারপাশে বহুতল ভবন ও চকচকে শপিং মল গড়ে উঠলেও এ বাড়তি আয়ের সুফল সব ধরনের ছোট ব্যবসায়ী পাচ্ছেন না। ছোট দোকান ও ক্যাফে মালিকদের মতে, চিপ কর্মীরা ঘরোয়া কেনাকাটায় এখনো বেশ মিতব্যয়ী।
লোটে ক্যাসল অ্যাপার্টমেন্টের বিপরীত পাশের এক ফুল বিক্রেতা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের ব্যবসায় এ বোনাস কোনো প্রভাব ফেলেনি। এ খাতের কর্মীরা তাদের স্ত্রী বা বান্ধবীদের জন্য খুব একটা ফুল কেনেন না।’
স্যামসাং ফাউন্ড্রি বিভাগের এক মধ্যম সারির কর্মকর্তা বলেন, ‘মেমোরি বিভাগের একজন সাধারণ কর্মী আমাদের বিভাগের প্রধানের চেয়েও বেশি বোনাস পাচ্ছেন।’
অন্যদিকে নন-মেমোরি বিভাগে ১৫ বছর ধরে কর্মরত এক ব্যবস্থাপক জানান, বিভাগটি কোম্পানির ভবিষ্যতের মূল চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও তাৎক্ষণিক মুনাফা না আসায় তারা কম বোনাস পাচ্ছেন। ফলে সাধারণ কর্মীদের মনোবল অনেক কমে গেছে।
এ জাতীয় আরো খবর..