গাছ কেটে কাঠ বানিয়ে আসবাবপত্র তৈরির চিরাচরিত নিয়ম বদলে দিয়েছেন এক ব্রিটিশ দম্পতি।
তারা কোনো কাঠ না কেটেই আস্ত গাছকে চেয়ারের আকৃতিতে বড় করে তুলছেন। ব্যতিক্রমী এ আসবাবের একেকটি বিক্রি হচ্ছে ৯০ হাজার ডলারে। আন্তর্জাতিক বাজারে শৈল্পিক চেয়ারগুলোর চাহিদা এখন আকাশচুম্বী।
অ্যালিস মুনরো ও গ্যাভিন মুনরো নামের দম্পতি ২০ বছর ধরে বিশেষ এ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। তারা যুক্তরাজ্যভিত্তিক উদ্যোগটির নাম দিয়েছেন ‘ফুল গ্রোন’।
ডার্বিশায়ারে অবস্থিত তাদের বিশেষ ফার্মে বর্তমানে শত শত গাছকে এভাবে চেয়ার, টেবিল বা ল্যাম্পশেডের আকৃতিতে বড় করা হচ্ছে।
অ্যালিস মুনরো জানান, একটি পূর্ণাঙ্গ চেয়ার তৈরি হতে সাধারণত ছয়-নয় বছর সময় লাগে। গাছটি পুরোপুরি চেয়ারের আকৃতি পাওয়ার পর সেটিকে কেটে এনে আরো এক বছর ধরে শুকানো হয়। সমগ্র প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি।
তিনি বলেন, ‘গাছের চারা যখন ছোট থাকে, তখন সেটির ডালপালাকে বিশেষভাবে তৈরি রিসাইকেলড বা পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের কাঠামোর ওপর দিয়ে বড় করা হয়। এসব প্লাস্টিক ফ্রেম গাছকে নির্দিষ্ট দিকে বাড়তে সাহায্য করে। এরপর গাছের ডালগুলো বড় হওয়ার সময় নির্দিষ্ট কিছু অংশে সেগুলোকে একে অন্যের সঙ্গে গ্রাফটিং বা কলম করে জুড়ে দেয়া হয়। ফলে পুরো গাছটি আলাদা কোনো জোড়াতালি ছাড়াই একটি একক শক্ত আসবাবে পরিণত হয়।
উদ্যোক্তা আরো বলেন, ‘আমরা ২০ বছর ধরে কাজ করছি। তবে এটি ৫০ বা ১০০ বছরের দীর্ঘযাত্রা।’
গ্যাভিনের মাথায় ধারণাটি আসে তার শৈশবের একটি স্মৃতি থেকে। ছোটবেলায় তিনি একটি বনসাই গাছ দেখেছিলেন, যা দেখতে হুবহু একটি চেয়ারের মতো ছিল। পরবর্তী সময়ে গ্যাভিন ‘ক্লিপেল-ফেইল সিন্ড্রোম’ নামের একটি বিরল জন্মগত মেরুদণ্ডের রোগে আক্রান্ত হন। ফলে তাকে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে কাটাতে হয় ও মেরুদণ্ড সোজা করার জন্য বেশ কয়েকটি অস্ত্রোপচার করাতে হয়। হাসপাতালে কাটানো সেই একাকী সময়ই তাকে ধৈর্য ধরতে ও প্রকৃতির গতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শিখিয়েছে।
কলেজের পড়াশোনা শেষ করে গ্যাভিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় কিছুদিন আসবাবপত্র তৈরির কাজ করেন। তখনই তিনি জীবন্ত গাছকেও দরকারি আসবাবের আকার দেয়া সম্ভব বলে আত্মবিশ্বাস পান। গ্যাভিন ও তার স্ত্রী অ্যালিস ২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসা শুরু করেন।
ব্যবসায় গ্যাভিন মূলত নকশাকার হিসেবে ও অ্যালিস যোগাযোগ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পরিবেশবান্ধব বিলাসবহুল পণ্যের বাজারে জীবন্ত চেয়ারগুলোর বাণিজ্যিক গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে বলে জানান দম্পতি। উচ্চমূল্যের কারণে চেয়ারগুলো এখন বৈশ্বিক শিল্প সংগ্রাহক ও বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
২০২২ সালে বিশ্বখ্যাত লাক্সারি ব্র্যান্ড লুই ভিটনের এক প্রদর্শনীতে ফুল গ্রোনের তৈরি বেশকিছু চেয়ার প্রদর্শন করা হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির সেন্ট লুইস আর্টস মিউজিয়াম ও সান ফ্রান্সিসকো মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট এসব অনন্য আসবাব কিনে নিয়েছে।
স্থায়ী প্রদর্শনী হিসেবে এগুলো স্থান পেয়েছে স্কটল্যান্ডের ন্যাশনাল মিউজিয়াম, রটারডামের মিউজিয়াম বোইজম্যানস ভ্যান ব্যুনিনজেন ও ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির বিশেষ সংগ্রহশালায়। টেকসই ফ্যাশন ও পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির নতুন যুগে ব্যবসাটি এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে মনে করেন অনেকে। —খবর বিবিসি
এ জাতীয় আরো খবর..