বিশ্বজুড়ে এআই ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের সম্প্রসারণের কারণে টিনের গুরুত্ব নতুন করে বাড়ছে। প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারীরাও এখন টিনের বাজারের দিকে নজর দিচ্ছেন। গত এক বছরে লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে (এলএমই) টিনের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এর পেছনে এআই খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের কারণে আগামী পাঁচ বছরে টিনের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই সার্ভারে ব্যবহৃত টিনের চাহিদা বর্তমানের তুলনায় প্রায় তিন গুণ হয়ে যাবে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি খনিজ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাংহাই মেটালস মার্কেটের (এসএমএম) জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ভিকি কিয়াও।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে এআই সার্ভারে বছরে প্রায় ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার টন টিন ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০৩০ সালে এ ব্যবহার বেড়ে ২২-২৫ হাজার টনে পৌঁছাতে পারে।’
ভিকি কিয়াও জানান, টিন এমন একটি ধাতু, যা সোল্ডার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। সোল্ডারের মাধ্যমে সিলিকন ওয়েফার থেকে তৈরি চিপকে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক উপাদানের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। কম্পিউটার সার্ভার, নেটওয়ার্কিং যন্ত্র, পাওয়ার মডিউল ও অন্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রে এ ধাতুর ব্যবহার রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে এআই ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের সম্প্রসারণের কারণে টিনের গুরুত্ব নতুন করে বাড়ছে। প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারীরাও এখন টিনের বাজারের দিকে নজর দিচ্ছেন। গত এক বছরে লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে (এলএমই) টিনের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এর পেছনে এআই খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভিকি কিয়াও বলেন, ‘২০৩০ সাল পর্যন্ত টিনের বৈশ্বিক চাহিদা গড়ে বছরে ১ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। এ প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হবে এআই খাত। তবে প্রচলিত কিছু শিল্পে চাহিদা কমে যাওয়ায় মোট প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা সীমিত থাকতে পারে।’
বিশ্লেষকদের মতে, টিন এখন শুধু একটি সাধারণ শিল্পধাতু নয়। এআই অবকাঠামো নির্মাণে এটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। এ কারণেই অনেকে একে এখন ‘কম্পিউট ধাতু’ বলেও উল্লেখ করছেন।
তবে চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ভিকি কিয়াও বলেন, ‘টিনের বাজার বেশ সংবেদনশীল। ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন দেশের সম্পদ সংরক্ষণ নীতির কারণে সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।’
বিশ্বের অন্যতম বড় টিন উৎপাদক ইন্দোনেশিয়া সম্প্রতি খনি পরিচালনার নিয়মে পরিবর্তন এনেছে। চলতি বছর ইন্দোনেশিয়ার টিন উৎপাদনের অনুমোদিত পরিমাণ ৫৫-৬০ হাজার টনের মধ্যে থাকতে পারে। ২০১৯ সালে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৮ হাজার টন।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চীনের পর ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম টিন উৎপাদক দেশ। এছাড়া ব্রাজিল, পেরু, অস্ট্রেলিয়া, মিয়ানমার ও ভিয়েতনামও গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক।
এসএমএমের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-৩০ সালের মধ্যে টিনের সরবরাহ গড়ে বছরে ১ দশমিক ১৬ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি কম হওয়ায় বাজারে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, টিন এমন একটি ধাতু যার প্রাকৃতিক মজুত সীমিত। পৃথিবীর ভূত্বকে জিংকের তুলনায় প্রায় ৫০ গুণ কম টিন রয়েছে। বর্তমান উৎপাদন হারে হিসাব করলে মাটির নিচে থাকা পরিচিত টিনের মজুত আরো ১৪-১৫ বছর স্থায়ী হতে পারে।
এ কারণে যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ টিনকে কৌশলগত বা গুরুত্বপূর্ণ খনিজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। একই সঙ্গে পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিংয়ের ওপরও জোর দেয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বছরগুলোতে এআই ডেটা সেন্টার, চিপ উৎপাদন ও ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণের ফলে টিনের চাহিদা আরও বাড়বে। সরবরাহ সীমিত থাকায় ধাতুটির দামও দীর্ঘমেয়াদে ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে।
এ জাতীয় আরো খবর..