শুক্রবার (২৯ মে) ঈদ-পরবর্তী দ্বিতীয় দিন ও সাপ্তাহিক ছুটির দিন সকাল থেকেই দিনভর রাজধানীর মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
বিকেলে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, সারাদিনে লাখো দর্শনার্থীর আগমন ঘটবে চিড়িয়াখানায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, এদিন সকাল ১০টার পর থেকে চিড়িয়াখানায় আসতে শুরু করেন দর্শনার্থীরা। প্রবেশপথেই দর্শনার্থীদের ভিড়। টিকিট কাটতেই লাইন। টিকিট ছাড়া ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না কোনো দর্শনার্থীকে। ২ বছরের উপরে হলেই টিকিট মূল্য ৫০ টাকা। এরপর টিকিট সংগ্রহ শেষে একে একে প্রবেশ করতে থাকেন ভেতরে। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে চিড়িয়াখানার ভেতর ও বাইরে যেন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
চিড়িয়াখানার ভেতরে ঢুকতেই সামনে বানরের দেখা। সেখানেই বাবা-মা ও স্বজনদের হাত ধরে শিশুরা আটকে যাচ্ছে। বানরের নাচানাচি, দোলনায় দোল খাওয়া, কখনো কখনো বানরে বানরে খুনসুটি যেন শিশুদের দুষ্টুমিরই প্রতিচ্ছবি। এসব চিত্র দেখে শিশুরা হাসছিল, কেউ আবার সঙ্গে বাদাম, চকলেটও এনেছে বানরকে দিতে।
শুধু বানরই না, বিভিন্ন পশুর খাঁচার সামনে ভিড় জমাতে দেখা যায় দর্শনার্থীদের। তীব্র আর ভ্যাপসা গরমের মধ্যে অনেক দর্শনার্থীকে আবার গাছের নিচে বসে জিরিয়ে নিতেও দেখা যায়।
বানরের খাঁচা পেরিয়ে বাঘ, সিংহ, জিরাফ, বন্য পাখি, উটপাখি, ঘোড়া, গাধা, বন্য শেয়ালেরও দেখা মেলে।
বাংলাদেশের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের খাঁচার সামনে দর্শনার্থীদের ভিড়ও অনেক। সেখানে শিশু দর্শনার্থীদের চোখ ছানাবড়া। কারণ খুব কাছে থেকে টাইগারকে দেখে শিহরিতো শিশুরা।
সেখানে কাছে বাবার কোলে উঠে পড়া এক শিশু জানায়, বাঘ ভয়ংকর হয়। সেই বাঘ এখানে। তাও খুব কাছে থেকে দেখা। যদিও বাঘ খাঁচায়, তবুও ভয় পাচ্ছি।
উত্তরা থেকে পরিবারের তিন সদস্য নিয়ে চিড়িয়াখানায় ঘুরতে এসেছেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, ঈদের দিন কোরবানি ছাড়াও অনেক ব্যস্ততা। আজ দুপুরের ব্যস্ততা সেরে বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতে এসেছি। প্রতিবছর ঈদের সময় ছুটিতে গ্রামে যাওয়া হয়। এবার ঢাকায় ঈদ কাটছে। শিশুদের বিনোদনের প্রধান আগ্রহ চিড়িয়াখানা। তাই এখানে ঘুরতে আসা।
দূর হলেও সরাসরি বাসে সদরঘাট থেকে চিড়িয়াখানায় এসেছেন আনিসুর রহমান। সঙ্গে ভাগ্নে ও ছেলে। তিনি বলেন, ছুটির দিন বিকেলে ভিড় বেশি হয়। ভাবছিলাম সকালেই যাব। এসে দেখছি, আমার মতো যেন সবারই চিন্তা। গরম, তবুও প্রচণ্ড ভিড়। তবে এমন ভিড়েও চিড়িয়াখানার সুবিধা হচ্ছে বড় জায়গা। ঘুরতে একদমই কষ্ট হচ্ছে না।
তিনি বলেন, কদিন পর খুলবে অফিস, ওদের স্কুল। শিশুদের মনোবিকাশ ও বিনোদনে সময় দেওয়ার এটাই শহুরে সময়। তাই সুযোগ পেয়েই চিড়িয়াখানায় আসছি। ফেরার পথে বিমান জাদুঘর দেখে ফিরব।
সামনে হাঁটতেই খাঁচায় নিদ্রায় গেছে বনের রাজা সিংহ। তা দেখেও হাসি থামে না শিশু দর্শনার্থীদের। সিংহ মামা বলে ডাকাডাকিতে বড়জোর সিংহ কান নাড়াচ্ছে। কিন্তু বাঘের মতো কাছে আসছে না, বসছেও না।
সেখানে আজহার উদ্দিন নামে এক বেসরকারি কলেজ শিক্ষক বলেন, একটা বিষয় পরিবর্তন আনা জরুরি মনে করছি। তা হচ্ছে চিড়িয়াখানায় ঢুকতেই রাখা উচিত বাঘ কিংবা সিংহের খাঁচা। শিশুরা এখানে আগ্রহ নিয়ে আসে। বাঘ-সিংহ দেখতেই। ওদের মানসিক সাহস বাড়াতে শুরুতে বানর নয়, সিংহ বা বাঘই রাখা উচিত।
সামনে যেতেই একটি গাছের ডাল ভেঙে পড়ার শব্দে নিমিষেই বন্দি বন্য পাখিরা সব কিচিরমিচির শুরু করে। অনেক শিশু আবার ফিরে যায় পাখির খাঁচার সামনে। এ সময় শিষ দিতে, গান গাইতে ও পাখিকে বাদাম দিতে দেখা যায়।
উটপাখির লম্বা গলা, হিল পায়ে শব্দ করে হেঁটে যাওয়া বা কখনো কখনো গাছের পাতা দিতেই দৌড়ে কাছে আসায় উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকে দর্শনার্থীরা।
এ সময় সঙ্গে আসা অভিভাবককে এক শিশুকে বলতে শোনা যায়, চাচ্চু, এটা কি সত্যিই পাখি! পাখি এত বড় হয়? এটা কি উড়তে পারে? এত বড় ঠোঁট! গাছের পাতা দেখছি খায়। ও আর কী খায়? প্রশ্নের পর প্রশ্ন।
অভিভাবক বলেন, উটপাখি হলেও উড়তে পারে না। ওর পাখনা আছে, কিন্তু শরীরে ওজন বেশি হওয়ার কারণে উড়তে পারে না। এমন দুই লাইনে উত্তর সেরে ওই শিশুকে নিয়ে অভিভাবক যান আরেক পাখির খাঁচার সামনে।
এ ছাড়া, ঈদুল আজহায় কোরবানির জন্য বিক্রি হওয়া অ্যালবিনো জাতের আলোচিত মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’-এর সবশেষ জায়গা হয়েছে জাতীয় চিড়িয়াখানায়। আলোচিত এই মহিষটির খাঁচা ঘিরে দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক অভিভাবক খুঁজতে খুঁজতে চিড়িয়াখানার কর্মীদের জিজ্ঞেস করে যান দেয়ালবন্দি আলোচিত মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে। চিড়িয়াখানার সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ্য করা গেছে সেখানে।
শ্যামলী থেকে বাবা-মায়ের হাত ধরে চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসা মাছুম নামে কিশোর বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া, টেলিভিশন সবখানে এই মহিষের খবর। মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চিড়িয়াখানায় আনা হয়েছে, আর যেহেতু আমরাও চিড়িয়াখানায় ঘুরতেই আসছি, না দেখলে কেমন হয়! অনেকবারই চিড়িয়াখানায় এসেছি, এবার মহিষটা বাড়তি আগ্রহে দেখছি।
জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক ডা. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, সাধারণত ঈদের পরে চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের ভিড় বেশি হয়। আজ (শুক্রবার) বিকেলের দিকে ভিড় বেড়েছে। আমরা আশা করছি, লক্ষাধিক দর্শনার্থীর উপস্থিতি হবে। গরমে দর্শনার্থীদের যাতে সমস্যা না হয়, সেজন্য পানির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। নামাজের ও ওয়াশরুমের ব্যবস্থা তো আছেই। আজ দর্শনার্থীরা চাইলে চিড়িয়াখানায় হওয়া আম-কাঁঠালের মতো মৌসুমি ফল ন্যায্যমূল্যে কিনতে পারছেন।
এ জাতীয় আরো খবর..