ইউরোপে মার্কিন পেমেন্ট জায়ান্টদের ওপর নির্ভরতা কমাতে নিজস্ব স্বাধীন অর্থ লেনদেন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে।
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে এ স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উভয় পক্ষই ইউরোপের নিজস্ব একটি স্বাধীন অর্থ লেনদেন ব্যবস্থা চায়। তবে নিজেদের আর্থিক স্বার্থ রক্ষা এবং নীতিগত পার্থক্যের কারণে এ প্রক্রিয়া অনেকটাই পিছিয়ে যাচ্ছে। খবর রয়টার্স।
কভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে ইউরোপের দেশগুলোতে ক্যাশলেস বা নগদহীন লেনদেন ব্যাপক হারে বেড়েছে। বর্তমানে ইউরোজোনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কার্ড লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ভিসা ও মাস্টারকার্ড। এর বাইরে পেপ্যাল ও অ্যাপলের মতো মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও ইউরোপে দ্রুত বাজার প্রসারিত করেছে। এ বড় ধরনের নির্ভরতা ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা মনে করছেন, বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে যেকোনো সময় এ অর্থ লেনদেন ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ইসিবি ২০২৯ সালের মধ্যে ‘ডিজিটাল ইউরো’ চালুর পরিকল্পনা করেছে। এটি মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা গ্যারান্টিযুক্ত একটি অনলাইন ওয়ালেট হবে, যা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হবে। তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ইসিবির এ উদ্যোগ নিয়ে বেশ চিন্তিত। তারা মনে করছেন, ডিজিটাল ইউরো চালু হলে সাধারণ গ্রাহকরা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে বেশি নিরাপত্তার আশায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল ওয়ালেটে জমা রাখবেন। এতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আমানত সংকটে পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো বিকল্প হিসেবে নিজস্ব বেসরকারি পেমেন্ট ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। সম্প্রতি নতুন করে ২৫টি বাণিজ্যিক ব্যাংক একটি বেসরকারি ইউরোপীয় জোটে যোগ দিয়েছে। জোটটি ইউরোর মূল্যের সঙ্গে মিল রেখে একটি নতুন ডিজিটাল মুদ্রা চালুর পরিকল্পনা করছে। স্বার্থের এ সংঘাতের কারণে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ডিজিটাল মুদ্রাসংক্রান্ত আইন পাসের প্রক্রিয়া তিন বছর ধরে আটকে আছে। তবে চলতি বছরের গ্রীষ্মকাল শেষ হওয়ার আগেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত ভোট হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ বিতর্কের মূল জায়গাটি হলো ট্রানজেকশন বা লেনদেন ফি। ইসিবি এ ডিজিটাল ইউরোর পুরো অবকাঠামো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিনামূল্যে দেয়ার পরিকল্পনা করেছে। এর বিনিময়ে তারা দোকানদার বা ব্যবসায়ীদের ওপর লেনদেনের ফি সীমিত করার প্রস্তাব করেছে। বর্তমানে ইউরোজোনে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি ইউরোর লেনদেন হয় কার্ডের মাধ্যমে। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসায়ীদের ফি সীমিত করা হলে বেসরকারি ব্যাংকগুলো বছরে প্রায় ৮০০-৯০০ কোটি ইউরোর রাজস্ব হারাবে।
ব্যাংকগুলোর এ বড় আর্থিক ক্ষতি কমাতে নতুন আইনে কিছু শর্ত দেয়া হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৩ হাজার ইউরো মূল্যের ডিজিটাল মুদ্রা নিজের কাছে রাখতে পারবেন। ইসিবি মনে করে, ডিজিটাল ইউরো ইউরোপজুড়ে একটি একক ও সমন্বিত পেমেন্ট ব্যবস্থা তৈরি করবে।
এদিকে স্পেনের ‘বিজুম’ ও ফ্রান্সের ‘ওয়েরো’র মতো স্থানীয় পেমেন্ট ব্যবস্থাগুলো নিজেদের পরিধি বাড়াচ্ছে। তবে বেসরকারি প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তারা সতর্ক করেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ দীর্ঘ বিলম্ব একটি বড় সমস্যা তৈরি করছে। ২০২৯ সালে যখন ডিজিটাল ইউরো চালু হবে, ততদিনে বাজার ও গ্রাহকের চাহিদা সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে, যার ফলে বর্তমান পরিকল্পনাগুলো তখন আর কার্যকর নাও থাকতে পারে।
এ জাতীয় আরো খবর..