দ্য ন্যাশনালের বিশ্লেষণ

২১ শতকে ‘পানি’ হতে পারে বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-২৯, | ১২:১৯:১৩ |
বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক শতক ধরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ‘জ্বালানি তেল’।

তেলের দখল বা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, যুদ্ধ ও বড় বড় চুক্তি। কিন্তু এখন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে পানি। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানির সংকট বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে পানির অধিকার বা ‘ওয়াটার রাইটস’ বড় অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনালের বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার কৌশলবিদ আমরো জাকারিয়া জানান, একবিংশ শতাব্দীতে তেলের স্থান দখল করতে যাচ্ছে পানি। বিশ্বজুড়ে শিল্প-কারখানা, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে পানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও খরার কারণে পানির উৎস কমছে। এতে অনেক দেশ এখন পানিকে শুধু জনসেবার বিষয় হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২১ শতকে অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে পানির গুরুত্ব তেলের মতো হয়ে উঠতে পারে। কারণ পানির বিকল্প নেই।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ লিটার অতিশুদ্ধ পানি প্রয়োজন হয়। এ পরিমাণ পানি যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৩ হাজার পরিবারের দৈনিক ব্যবহারের সমান। বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি ২০২৩ সালে প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ ঘনমিটার পানি ব্যবহার করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে চিপ শিল্পে পানির চাহিদা দ্বিগুণ হবে। এছাড়া ডেটা সেন্টারগুলো ২০২৪ সালে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি লিটার পানি ব্যবহার করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ পরিমাণ বেড়ে ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন লিটারে পৌঁছতে পারে। অন্যদিকে কৃষি খাত এখনো বিশ্বের মোট পানির প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবহার করে।

আমরো জাকারিয়ার মতে, আগে পানি ছিল অর্থনীতির আড়ালের একটি সাধারণ উপাদান। এখন তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় শর্ত হয়ে উঠছে। অনেক অঞ্চলে নতুন শিল্প স্থাপন বা নগর সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে পানি পাওয়া যাবে কিনা।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা সরবরাহের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি হতে পারে। ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো চরম পানিসংকটে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ও বিনিয়োগকারীরা এখন পানিকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা শুরু করেছে।

তেল, স্বর্ণ বা গমের মতো পানির এখনো তেমন কোনো নির্দিষ্ট ও উন্মুক্ত বিশ্ববাজার গড়ে ওঠেনি। তবে ধীরে ধীরে সে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩৩ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পানি সেবা খাতের বাজার ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াবে। এ বাজারের বড় অংশ জুড়ে থাকবে পানির অধিকার, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, ইউটিলিটি ও আর্থিক সেবা।

এরই মধ্যে বিশ্বের কিছু দেশে পানির বাণিজ্যিক বাজার বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। অস্ট্রেলিয়ার মারে-ডার্লিং অববাহিকায় বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত পানিবাজার গড়ে উঠেছে। সেখানে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলারের পানি লেনদেন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলেও কৃষি, শিল্প ও নগর ব্যবহারের জন্য পানির আলাদা বাজার তৈরি হয়েছে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত পানি প্রতি একর-ফুট প্রায় ২০ ডলারে লেনদেন হলেও নগর ও শিল্প খাতে এর দাম ৭০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত ওঠে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, ক্যালিফোর্নিয়ায় সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরিতে এক একর-ফুট পানি ব্যবহার করে রাজ্য সরকারের রাজস্ব আয় হয় প্রায় ৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার। অথচ একই পরিমাণ পানি তুলা বা আলফালফা চাষে ব্যবহার করলে আয় হয় ৬০ ডলার। এ বিশাল পার্থক্যের কারণে পানির অধিকার বা ‘ওয়াটার রাইটস’ এখন অনেকটা জমি উন্নয়নের অধিকারের মতো মূল্যবান সম্পদে পরিণত হচ্ছে।

পানির ক্রমবর্ধমান সংকট ও চাহিদাকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে অবকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলো পানি খাতে ৭ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।

পানির ঘাটতি এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালে মরক্কোয় বৃষ্টিপাত প্রায় ২৮ শতাংশ কমে যাওয়ায় দেশটির কৃষিপণ্য উৎপাদন ২০ শতাংশ কমে ও দেশের গম আমদানির ওপর নির্ভরতা আরো বাড়ে। তিউনিসিয়ায়ও একই সময়ে শস্য উৎপাদন প্রায় ৮০ শতাংশ ধসে পড়ে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..