✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-২৩, | ১৩:০৯:৫৭ |বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে অস্ট্রেলিয়া। তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার পাঁচ মাস পর দেখা যাচ্ছে, ফাঁকফোকর গলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিরে আসছে কিশোর-কিশোরীরা। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে তারা সহজেই বয়স যাচাই ব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগাচ্ছে।
২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর আইন কার্যকর হওয়ার পর মেলবোর্নের ১৫ বছর বয়সী র্যামসে ড্যাগলিশ তার পছন্দের প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে প্রবেশ করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন। তবে সেই বাধা টিকেছিল মাত্র এক মিনিট। নিজের প্রোফাইলে জন্মতারিখ পরিবর্তন করে তিনি নিজেকে ১৯ বছর বয়সী হিসেবে দেখান এবং ইউটিউব কোনও অতিরিক্ত যাচাই ছাড়াই তা গ্রহণ করে।
র্যামসে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য স্ট্রেইটস টাইমস-কে বলেন, “এটা খুবই সহজ ছিল। পাসওয়ার্ডও লাগেনি। এক মিনিটের মধ্যেই বুঝে গেলাম কীভাবে নিয়মটা এড়িয়ে যাওয়া যায়।”
যদিও তিনি এই নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করেন। তার ভাষায়, “অনলাইনে অনেক খারাপ ঘটনা ঘটছে, শিশুরা নানা ধরনের টার্গেটে পরিণত হচ্ছে।” তবে আইন প্রয়োগ নিয়ে তার মন্তব্য, “বাস্তবায়নটা অনেকটাই হাস্যকর। আমার বয়সী অনেকের ওপর এর তেমন কোনও প্রভাব পড়েনি।”
গবেষণায় উঠে এলো সীমিত প্রভাব
অস্ট্রেলিয়ার তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের করা এক জরিপে দেখা গেছে, ১০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১ হাজার ২৭ জনের মধ্যে ৬১ শতাংশ তরুণ-তরুণী জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কোনও প্রভাব পড়েনি। মাত্র ২৬ শতাংশ বলেছেন তারা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। বাকিরা বলেছেন, মাঝারি মাত্রার প্রভাব পড়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অনেক ব্যবহারকারীকে বয়স যাচাইয়ের মুখোমুখিই হতে হয়নি। আবার যারা হয়েছে, তাদের অনেকেই ভুল তথ্য দিয়ে, বড় ভাই-বোনের সহায়তা নিয়ে অথবা ভিপিএন ব্যবহার করে বিদেশ থেকে লগইন করার ভান করে সহজেই নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে গেছে।
সেলফি দিয়েই ‘১৬ বছরের বেশি’ প্রমাণ
পার্থের ১৪ বছর বয়সী অ্যাডিসন গ্রান্টও এই নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করেন। তবে তিনিও সহজেই নিয়ম এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন।
আইন কার্যকর হওয়ার সময় তার বয়স ছিল ১৩। সে সময় স্ন্যাপচ্যাট তাকে বয়স যাচাইয়ের জন্য সেলফি দিতে বলে। অ্যাডিসন ফোন ক্যামেরার সামনে বিভিন্ন কোণে মুখ দেখিয়ে ছবি আপলোড করেন। প্রায় ৩০ সেকেন্ড পর অ্যাপটি জানিয়ে দেয়, তিনি ১৬ বছরের বেশি বয়সী-এবং তাকে অ্যাপ ব্যবহারের অনুমতি দেয়।
অ্যাডিসন বলেন, “নিষেধাজ্ঞার আগে যা করতাম, এখনও সবই করতে পারছি।”
নিষিদ্ধ প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে অন্য অ্যাপে ঝুঁকছে তরুণরা
অস্ট্রেলিয়ার এই আইনের আওতায় রয়েছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, কিক, রেডিট, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক, থ্রেডস, টুইচ, এক্স এবং ইউটিউব।
তবে অ্যাডিসনের মতে, অনেক কিশোর এখন হোয়াটসঅ্যাপে চলে যাচ্ছে, কারণ সেটি নিষেধাজ্ঞার আওতায় নেই। তার দাবি, আগে তিনি প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহার করতেন, এখন সপ্তাহে প্রায় ৩০ মিনিট ব্যবহার করেন। কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপে এখন প্রতিদিন প্রায় ৪৫ মিনিট সময় কাটান।
ইউটিউব তার অ্যাকাউন্ট পুরোপুরি বন্ধ না করলেও ভিডিওতে লাইক দেওয়া বা চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করার মতো কিছু সুবিধা সীমিত করেছে। তবে এতে তার ব্যবহার কমেনি।
অ্যাডিসন বলেন, “আমি খুশি ছিলাম কারণ বন্ধু ও আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পেরেছি। কিন্তু এখন প্রতিদিন স্ন্যাপচ্যাটে মেসেজ করতে হয়, কারণ ‘স্ট্রিক’ বজায় রাখতে হয়। এটা আবার আমাকে সেই অ্যাপের দিকেই টেনে নিচ্ছে।”
বয়স যাচাই পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন
নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্ল্যাটফর্মগুলো বিভিন্নভাবে বয়স যাচাই করছে। কেউ পাসপোর্ট বা সরকারি পরিচয়পত্র চাইছে, কেউ সেলফি বা ভিডিও বিশ্লেষণ করছে, আবার কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অ্যালগরিদম ব্যবহার করছে।
তবে মার্চ মাসে অস্ট্রেলিয়ার ই-সেফটি কমিশনারের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্ল্যাটফর্মগুলো কিছু পদক্ষেপ নিলেও ‘উল্লেখযোগ্য সংখ্যক’ ১৬ বছরের কম বয়সী এখনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৪৭ লাখ অ্যাকাউন্ট বন্ধ বা সীমিত করা হয়েছে। এছাড়া ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত আরও ৩ লাখ ১০ হাজার অ্যাকাউন্টকে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের বয়স যাচাইয়ের অনুরোধই জানানো হয়নি। আবার কেউ ১৬ বছরের কম বয়সী বলে জানালেও তাকে একাধিকবার যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যতক্ষণ না সফল হয়।
ই-সেফটি কমিশনার জুলি ইনম্যান গ্রান্ট সতর্ক করে বলেছেন, আইন না মানলে প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৯৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার জরিমানা করা হতে পারে।
‘ডিজিটাল ডিউটি অব কেয়ার’ আইনের পরামর্শ
মেলবোর্নের আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর হিউম্যান-এআই ইনফরমেশন এনভায়রনমেন্টসের পরিচালক অধ্যাপক লিসা গিভেন বলেন, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে রাখতে পারছে না।
তার মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো ‘ডিজিটাল ডিউটি অব কেয়ার’ আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্য হয়। এর মধ্যে থাকবে ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ, অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা এবং শিশুদের সুরক্ষায় সক্রিয় পদক্ষেপ।
তিনি বলেন, “অন্য দেশগুলো অস্ট্রেলিয়ার নিষেধাজ্ঞার খবর দেখছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো- অনেক শিশু এখনও প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় রয়েছে বা অন্য প্ল্যাটফর্মে চলে গেছে।”
সাইবার বুলিং কিছুটা কমেছে
তবে অ্যাডিসনের মতে, হোয়াটসঅ্যাপে স্থানান্তরের ফলে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও এসেছে। কারণ, সেখানে যোগাযোগের জন্য সাধারণত ফোন নম্বর প্রয়োজন হয়।
তার ভাষায়, “স্ন্যাপচ্যাটে আমি অনেক ঘৃণামূলক বার্তা, মারামারির ভিডিও, এমনকি ‘মরে যাও’ ধরনের মন্তব্য দেখেছি। হোয়াটসঅ্যাপে তেমন কিছু দেখিনি।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে একক কোনও সমাধান নেই। বয়স যাচাই কখনওই শতভাগ কার্যকর হবে না। তাই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সরকার এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সূত্র: দ্য স্ট্রেইটস টাইমস