কুরবানি করার আগে নিজেকে যে প্রশ্নগুলো করা জরুরি

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-১৪, | ২১:২১:১২ |

ইসলামে কোনো আমল সঠিকভাবে আদায় করার প্রথম শর্ত হলো ইলম বা জ্ঞান অর্জন। কারণ না জেনে কোনো ইবাদত করলে তা অনেক সময় শুদ্ধভাবে সম্পন্ন হয় না, আবার কখনো ইবাদতের আসল উদ্দেশ্যও হারিয়ে যায়। কুরবানি এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা পালন করার আগে এর প্রকৃত অর্থ, উদ্দেশ্য ও নিয়ত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।

অনেকেই কুরবানি করেন, কিন্তু কুরবানি আসলে কী, কেন করা হয়, এর মাধ্যমে আল্লাহ কী দেখতে চান— সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা সবার নেই। অথচ কুরবানির মূল শিক্ষা লুকিয়ে আছে মানুষের অন্তরের তাকওয়া, আনুগত্য ও আল্লাহর প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মধ্যে।

কুরবানি কী? এ সম্পর্কে আল্লাহ কী বলেছেন?

কুরবানি হচ্ছে মনের তাকওয়া এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে পশু জবাই করা। কুরবানির মধ্যে যদি লোক দেখানো, সামাজিক মর্যাদা লাভ কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে সেই কুরবানি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন—

لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ ۗ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ

‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কুরবানির পশুর গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের মনের তাকওয়া। এভাবেই তিনি এসব পশুকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদের হেদায়াত দিয়েছেন। আর সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ দিন।’ (সুরা আল-হজ:  আয়াত ৩৭)

এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়— কুরবানির আসল বিষয় পশুর আকার বা দামের মধ্যে নয়; বরং নিয়তের বিশুদ্ধতার মধ্যে।

কুরবানি করার আগে নিজেকে যে প্রশ্নগুলো করা জরুরি

কুরবানির সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন মুমিনের কিছু বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত—

> আমি কেন কুরবানি করছি?

> এই কুরবানি কি শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য?

> কুরবানির সময় আমার হৃদয়ের অবস্থা কেমন?

> আমি কি লোক দেখানোর জন্য বড় পশু কিনছি?

> কুরবানির গোশত ও রক্ত কি সত্যিই আল্লাহর কাছে পৌঁছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর যদি আন্তরিকভাবে খোঁজা হয়, তাহলে মানুষ বুঝতে পারবে— কুরবানি মূলত আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার শিক্ষা।

কুরবানির সময় মুমিনের অন্তরে যেমন অনুভূতি থাকা উচিত

কুরবানি করার সময় প্রত্যেক মুমিন মুসলমানের অন্তরে এই নিয়ত থাকা জরুরি—

‘হে আল্লাহ! শুধু তোমার সন্তুষ্টির জন্যই আমি কুরবানি করছি। তুমি আমাদের কুরবানি কবুল করে নাও।’

কারণ আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছে না; পৌঁছে শুধু বান্দার খাঁটি নিয়ত ও তাকওয়া। এ জন্য কুরবানি করার আগে নিজের নিয়তকে পরিশুদ্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। যদি নিয়ত বিশুদ্ধ না হয়, তাহলে কুরবানির প্রকৃত সওয়াব থেকে মানুষ বঞ্চিত হবে।

লোক দেখানো কুরবানি কেন ভয়ংকর?

বর্তমান সমাজে অনেক সময় কুরবানি ইবাদতের চেয়ে প্রতিযোগিতার রূপ নেয়। কেউ বড় পশু কেনার প্রতিযোগিতায় নামে, কেউ আবার দামি পশু এনে মানুষের প্রশংসা কুড়াতে চায়। অনেকের মুখে শোনা যায়—

> কে সবচেয়ে বড় গরু কিনলো?

> কার পশুর দাম সবচেয়ে বেশি?

> কে সবচেয়ে বেশি পশু কুরবানি করল?

এ ধরনের মানসিকতা কুরবানির আত্মাকে নষ্ট করে দেয়। কারণ ইবাদত তখনই ইবাদত হয়, যখন তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا أَوْ إِلَى امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ

‘নিশ্চয়ই সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আর মানুষ তার নিয়্যাত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে। তাই যার হিজরত হবে ইহকাল লাভের অথবা কোন নারীকে বিবাহ করার উদ্দেশে- তবে তার হিজরত সে উদ্দেশেই হবে, যে জন্যে, সে হিজরত করেছে।’ (বুখারি ১)

অতএব, নিয়ত যদি লোক দেখানো হয়, তাহলে সেই কুরবানি ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে না।

ব্যাপকভাবে কুরবানি করার কিছু ভুল উদ্দেশ্য

সমাজে এমন কিছু উদ্দেশ্য দেখা যায়, যেগুলোর কারণে কুরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। যেমন—

১. গোশতের লাভের চিন্তা

কিছু মানুষ কুরবানিকে গোশত পাওয়ার মাধ্যম মনে করে। তারা মনে করে, কুরবানি করলে প্রচুর মাংস পাওয়া যাবে। অথচ এ ধরনের নিয়ত থাকলে কুরবানির মূল উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যায়।

২. নেতৃত্ব বা প্রভাব প্রতিষ্ঠা

কিছু মানুষ সমাজে নিজেকে প্রভাবশালী বা নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে কুরবানি করে। এটিও ইখলাসের পরিপন্থি।

৩. নাম-যশ অর্জনের আকাঙ্ক্ষা

অনেকে একাধিক বড় পশু কুরবানি করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান। সামাজিক মর্যাদা ও প্রশংসা পাওয়ার নিয়ত থাকলে সেই কুরবানি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।

কুরবানি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ছে

আলহামদুলিল্লাহ, বর্তমান সময়ে আলেম-ওলামা ও ইসলামিক স্কলারদের আলোচনা, ওয়াজ-মাহফিল ও গণমাধ্যমের কারণে মানুষ কুরবানি সম্পর্কে আগের তুলনায় অনেক সচেতন হয়েছে। অনেকেই এখন কুরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝে ইবাদত পালনের চেষ্টা করছেন। তবে অনেক সময় অসতর্কভাবে বলা কিছু কথা কিংবা অন্তরের গোপন নিয়ত কুরবানির সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়। তাই কুরবানির আগে বারবার নিজের অন্তরকে যাচাই করা জরুরি। আর কুরআনের এই আয়াতকে বেশি বেশি স্মরণে রাখুন —

لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ ۗ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ

‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কুরবানির পশুর গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের মনের তাকওয়া। এভাবেই তিনি এসব পশুকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা করো এজন্য যে, তিনি তোমাদের হেদায়াত দিয়েছেন। আর সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ দিন।’ (সুরা আল-হজ: আয়াত ৩৭)

কুরবানি কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান নয়; এটি একজন বান্দার অন্তরের ইখলাস, তাকওয়া ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। তাই কুরবানির আগে পশু কেনার চেয়ে বেশি জরুরি নিজের নিয়তকে শুদ্ধ করা। আমরা যেন কুরবানিকে অহংকার, প্রতিযোগিতা কিংবা লোক দেখানোর মাধ্যম না বানাই। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর মতো নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে খাঁটি নিয়তে কুরবানি করার, ইবাদতের হক আদায় করার এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..