যুক্তরাষ্ট্রের নতুন যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে ইরানের?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-০৯, | ১৩:২১:৪৩ |

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে ইরান। তবে একই সময়ে হরমুজ প্রণালীতে উভয় পক্ষের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনাও ঘটছে। ফলে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি যুদ্ধ পরিস্থিতিও পুরোপুরি থেমে যায়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার রাতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ইরানের নেতৃত্বকে ‘উন্মাদ’ আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, দ্রুত চুক্তিতে রাজি না হলে তেহরানকে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হবে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে- যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবে ইরান কী ধরনের প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে? আর কোনও সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে তেহরানকে কতটা ছাড় দিতে হবে?

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রস্তাবে কী রয়েছে?
মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর তথ্যানুযায়ী, ওয়াশিংটন চলতি সপ্তাহে ইরানের কাছে ১৪ দফার একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে।

এই প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরানকে অন্তত ১২ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা না করার অঙ্গীকার করতে হবে। এছাড়া ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে হস্তান্তরের কথাও বলা হয়েছে।

এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করবে এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে।

প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী আবার পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হবে।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে ইরান। ২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে হওয়া পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালে একতরফাভাবে সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর আবারও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

ইরানের প্রতিক্রিয়া কী?
রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের জবাব দেয়নি তেহরান। তবে দেশটির নেতারা ইতোমধ্যে প্রস্তাবের বিভিন্ন দিক নিয়ে আপত্তি তুলেছেন।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই বলেন, এই প্রস্তাব ‘বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার চেয়ে বেশি মার্কিন ইচ্ছার তালিকা’।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “অপারেশন ট্রাস্ট মি ব্রো ব্যর্থ হয়েছে।” বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আশাবাদী অবস্থানকে ব্যঙ্গ করেছেন।

এদিকে বৃহস্পতিবার ইরানের সামরিক বাহিনী অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি একটি তেলবাহী জাহাজ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজেইরাহ বন্দরের কাছে আরেকটি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ ইরানের বন্দর খামির, সিরিক ও কেশম দ্বীপে মার্কিন বিমান হামলার অভিযোগও তোলে তেহরান।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালীতে তাদের নৌবাহিনী ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও দ্রুতগতির নৌকার হামলার মুখে পড়ে। এর জবাবে ‘হুমকি ধ্বংস’ এবং ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।

তবে এত উত্তেজনার মধ্যেও ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও ভেঙে পড়েনি।

মধ্যস্থতা ও কূটনীতি এখনও চলছে
তেহরান থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক রেসুল সেরদার আতাস জানিয়েছেন, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন-তারা এখনও মার্কিন প্রস্তাব পর্যালোচনা করছেন।

এর আগে খবর বের হয়েছিল, পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের জবাব পাঠানো হতে পারে। তবে তা এখনও নিশ্চিত হয়নি।

আতাস বলেন, “সামরিক সংঘর্ষ ও উত্তেজনা চললেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। উভয়পক্ষই এখনও আলোচনার পথ খোলা রাখতে আগ্রহী।”

তবে তার ভাষায়, “ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি দাবি অবাস্তব, অযৌক্তিক এবং সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের কৌশল।”

এ পর্যন্ত কতগুলো প্রস্তাব এসেছে?
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে একাধিক প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে দুই পক্ষ।

চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ১৪ দফা প্রস্তাবের আগে ইরানও একটি ১৪ দফা পরিকল্পনা দিয়েছিল। সেখানে তারা শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, পুরো যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি চেয়েছিল।

ইরানের প্রস্তাবে ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ হামলা না করার নিশ্চয়তা, ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালীর জন্য নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

এর আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগের দিনও ইরান ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছিল। ট্রাম্প সেটিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব’ বললেও ‘যথেষ্ট নয়’ বলে মন্তব্য করেন।

পারমাণবিক ইস্যুতে কি ছাড় দেবে ইরান?
বিশ্লেষকদের মতে, মূল অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে।

ইরান বরাবরই বলে আসছে, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি)-এর সদস্য হিসেবে শান্তিপূর্ণ কাজে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে ‘চরম সীমা বা অপরিবর্তনীয় শর্ত’ হিসেবে দেখছে।

বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য সাধারণত ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হয়।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে ইরানকে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র তা পুরোপুরি শূন্যে নামিয়ে আনার দাবি তুলেছে।

বিশ্লেষক নেগার মোরতাজাভি মনে করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি শেষ হলে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কিছু নমনীয়তা দেখাতে পারে। তবে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে রাজি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

আল-জাজিরার প্রতিবেদক আতাস জানান, ইরান বর্তমানে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা নয়, বরং ‘সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ’ করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

তার ভাষায়, “ইরান চায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সরাসরি গ্যারান্টি, যাতে ভবিষ্যতে আর হামলার শিকার না হতে হয়। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারও চায় তেহরান।”

সমঝোতার পথ কতটা কঠিন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান অবস্থায় উভয় পক্ষকেই কিছু কঠিন ছাড় দিতে হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী বায়েজ বলেন, “সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে হয় দুই পক্ষকেই কষ্টকর ছাড় দিতে হবে, নয়তো বড় মতপার্থক্যের বিষয়গুলো ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রেখে কাঠামোগত সমঝোতায় যেতে হবে।”

যুক্তরাজ্যের ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ক্রিস ফেদারস্টোনের মতে, ইরান রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নিজের অবস্থানে অনড় থেকেছে এবং এতে ট্রাম্প প্রশাসন কিছুটা বিস্মিত হয়েছে।

তার ভাষায়, “ইরান বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার কোনও ইঙ্গিত দেয়নি। কারণ তারা মনে করে, ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে- এমন বিশ্বাস করার মতো পরিস্থিতি নেই।”

সব মিলিয়ে, কূটনৈতিক আলোচনা এখনও চলমান থাকলেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব রয়ে গেছে। ফলে যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপ নেবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। সূত্র: আল-জাজিরা

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..