‘লং কভিডে’ ওইসিডির অর্থনীতিতে বছরে ১৩৫ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা

লং কভিডের অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রভাব আগামী এক দশক পর্যন্ত বজায় থাকবে | ছবি : রয়টার্স

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-০৯, | ১৮:৫৮:৪৩ |
কভিড-১৯ মহামারীর তীব্রতা এখন আর নেই। তবে সংক্রামক ব্যাধিটির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বা ‘লং কভিড’ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মহামারীর ছয় বছর পরও লং কভিডের কারণে ওইসিডিভুক্ত সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতিতে প্রতি বছর ১৩ হাজার ৫০০ কোটি বা ১৩৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে বলে সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) গতকাল প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনটি বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশাল এ অংকের আর্থিক ক্ষতি কেবল স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ে নয়, বরং এর বড় অংশই আসবে উৎপাদনশীলতা হ্রাস, কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি ও অসুস্থতার কারণে কর্মীদের অকালে শ্রমবাজার থেকে বিদায় নেয়ায়।

উল্লেখ্য, ওইসিডি বা অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা ৩৮টি সদস্য দেশের একটি আন্তর্জাতিক ফোরাম। জোটটি উন্নত ও গণতান্ত্রিক অর্থনীতিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে কাজ করে। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সংস্থার সদর দপ্তর প্যারিসের ফ্রান্সে অবস্থিত।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, লং কভিডের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রভাব অন্তত আগামী এক দশক পর্যন্ত বজায় থাকবে। এ সময় দেশগুলোর মোট জিডিপির ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলোর জিডিপি দশমিক ১ থেকে দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ফলে সব মিলিয়ে বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।

গবেষণা বলছে, উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া ও শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ হ্রাস পাওয়াই এ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রধান কারণ।

প্রকাশনাটির সমন্বয়কারী ও জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ গুইলাম ডেডেট বলেন, ‘‌এ গবেষণা প্রথমবারের মতো ইইউ এবং ওইসিডি দেশগুলোয় লং কভিডের অর্থনৈতিক বোঝার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরেছে। মহামারীর তীব্র পর্যায় শেষ হলেও এর রেশ সমাজ ও অর্থনীতিতে আরো বহু বছর ধরে বজায় থাকবে।’

গবেষণাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওইসিডিভুক্ত দেশগুলো এরই মধ্যে মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বার্ধক্যজনিত কারণে শ্রমশক্তির সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। লং কভিড এ বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে আরো প্রকট করে তুলছে। অর্থনীতিবিদরা আগে এ প্রভাব নিরূপণে হিমশিম খেলেও বর্তমান গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যে দেখা গেছে, কভিড-১৯ মহামারীর পর স্বাস্থ্যজনিত কারণে কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি ও শ্রমবাজার থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে যাওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ লং কভিডে আক্রান্ত। আক্রান্তরা দীর্ঘ মাস বা বছর ধরে শ্বাসকষ্ট, চরম ক্লান্তি ও মানসিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার (ব্রেইন ফগ) মতো উপসর্গে ভুগছেন।

যদিও অনেক দেশ লং কভিড শনাক্তকরণ ও এর মোকাবেলায় নীতিমালা তৈরি করেছে, তবু বড় ধরনের কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে ওইসিডি। বিশেষ করে রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি সেবা দেয়া ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে অনেক দেশই পিছিয়ে আছে।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি পদক্ষেপগুলো মূলত স্বাস্থ্য খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা নীতিমালার সঙ্গে এর কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এছাড়া বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন কেন কিছু মানুষ লং কভিডে আক্রান্ত বা এর স্থায়ী চিকিৎসা কী। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া ও দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ এর জন্য দায়ী।

তবে ওইসিডি মনে করছে, ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের হিসাবটি সম্ভবত প্রকৃত ক্ষতির তুলনায় কম। অনেক ক্ষেত্রেই তথ্যের অভাবে এর গভীরতা পুরোপুরি পরিমাপ করা সম্ভব হয় না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লং কভিড কেবল একটি স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এটি বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক উৎপাদনের গতি কমিয়ে দেয়ার একটি ‘কাঠামোগত ব্রেক’। লং কভিডের মোকাবেলা করতে হলে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও সামাজিক নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে বলে মনে করছেন তারা।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..