যুদ্ধের প্রভাব: মধ্যপ্রাচ্যের তেলবহির্ভূত খাতে শ্লথগতি

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ ও নৌ-পরিবহন ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে যুদ্ধ পরিস্থিতি | ছবি : দ্য অ্যারাবিয়ান মিরর

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-০৮, | ১৮:৩০:৪৮ |

বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কুয়েত ও মিসরের তেলবহির্ভূত ব্যবসায়িক খাতে প্রবৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। মার্চে এসব দেশের বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া, চাহিদা হ্রাস এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। খবর আরব নিউজ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরান এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া সংঘাত এ অঞ্চলের আকাশপথ ও নৌ-পরিবহন ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা জেঁকে বসেছে।

অর্থনৈতিক অবস্থার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স বা পিএমআই সূচকে দেখা গেছে, মার্চে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ব্যবসায়িক পরিবেশ সংকুচিত হয়েছে। উল্লেখ্য, এ সূচকে ৫০-এর ওপরে থাকা প্রবৃদ্ধি বা সম্প্রসারণ, আর ৫০-এর নিচে থাকা সংকোচন নির্দেশ করে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই): সংযুক্ত আরব আমিরাতের পিএমআই সূচক ফেব্রুয়ারির ৫৫ থেকে কমে মার্চে ৫২ দশমিক ৯-এ নেমে এসেছে। যদিও এখনো ৫০-এর ওপরে থাকায় ‘সম্প্রসারণ’ বোঝাচ্ছে, তবুও এটি ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর দেশটিতে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির হার।

কুয়েত: সবচেয়ে ভয়াবহ অবনতি হয়েছে কুয়েতের। দেশটির পিএমআই সূচক ৫৪ দশমিক ৫ থেকে ভূমিধস পতন হয়ে ৪৬ দশমিক ৩-এ নেমেছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্যানুযায়ী, গত এক বছরের বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম কুয়েতের তেলবহির্ভূত খাত প্রবৃদ্ধি হারিয়ে সংকোচনের মুখে পড়েছে।

মিসর: মিসরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশটির পিএমআই সূচক ৪৮ দশমিক ৯ থেকে কমে ৪৮-এ দাঁড়িয়েছে, যা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের ইকোনমিকস ডিরেক্টর অ্যান্ড্রু হার্কার জানান, কুয়েতের পিএমআই সূচক বলছে যুদ্ধ তেলবহির্ভূত ব্যবসায়িক খাতে বড় আঘাত হেনেছে।

কুয়েতের কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, উড়োজাহাজ ও জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় নতুন অর্ডারের পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে গেছে।

দেশটির পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ৩৮ মাসের মধ্যে এ প্রথম কুয়েতের কোম্পানিগুলো উৎপাদন এবং নতুন অর্ডারের ক্ষেত্রে নিম্নমুখী প্রবণতা রেকর্ড করেছে। সংকোচনের এ গতি ২০২১ সালের মে মাসের পর সবচেয়ে তীব্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ আছে, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ব্যবসা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে রফতানি চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এদিকে কাজের চাপ কমে যাওয়ায় কুয়েতের কোম্পানিগুলো কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছে।

গত ২৬ মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো কুয়েতের ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নিয়ে কোনো আশার কথা জানাননি। এ পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে মূলত যুদ্ধ কতদিন চলবে তার ওপর।

ব্যয় বৃদ্ধি ও আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতিতে মিসরের চিত্র আরো জটিল। সেখানে যুদ্ধের প্রভাবে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল জানিয়েছে, ২০২৪ সালের শেষের দিকের পর থেকে গত মার্চে মিসরীয় কোম্পানিগুলো ইনপুট কস্ট বা উৎপাদন খরচে সবচেয়ে তীব্র বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছে।

মিসরের সংকটের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে এক. যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। দুই. বিশ্ববাজারে অস্থিরতার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ডলারের মান শক্তিশালী হয়েছে, যা মিসরীয় মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তিন. চাহিদা কমে যাওয়ায় এবং খরচ বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানিগুলো গত ১০ মাসের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে তাদের পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।

তবে আশার কথা শুনিয়েছেন এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের সিনিয়র ইকোনমিস্ট ডেভিড ওয়েন। তিনি বলেন, ‘মিসরের পিএমআই সূচক কমলেও দেশটির বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশের কাছাকাছি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) শুরুর দিকে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি থাকায় অভ্যন্তরীণ তেলবহির্ভূত খাত এখনো একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

সার্বিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের ব্যবসায়িক খাতের ওপর যুদ্ধের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। মিসরের বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলোর জরিপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আগামী ১২ মাসের ব্যবসায়িক পূর্বাভাস নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছে। যদিও কুয়েতের কিছু প্রতিষ্ঠান আগ্রাসী মার্কেটিং ও প্রতিযোগিতামূলক দামের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু যুদ্ধের ব্যাপ্তি বাড়লে পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তীব্র ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার এ সময়ে জিজিসি অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিমান ও নৌপথের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে না আসা পর্যন্ত এ স্থবিরতা কাটানো কঠিন হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..