দুগ্ধজাত পণ্য

বৈশ্বিক সংকটেও বাড়ছে উৎপাদন

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-৩০, | ১৫:৩৭:৪৮ |
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান পরিবহন ব্যয়ের প্রভাবে আন্তর্জাতিক ডেইরি বা দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

লজিস্টিক খরচ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক চাহিদার ধরনে পরিবর্তনের ফলে রফতানিকারক দেশগুলো নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ডেইরি পণ্যের বাজার আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে বলে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানা গেছে। খবর ফারমারস উইকলি।


বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি মার্চ পর্যন্ত দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারে এ অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যার মূল কারণ হিসেবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক লজিস্টিক খাতের ঝুঁকিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জাহাজ ভাড়া ও বীমা খরচের ওপর। লোহিত সাগর ও সংলগ্ন এলাকায় অস্থিরতার কারণে অনেক কোম্পানি দীর্ঘ পথ ঘুরে পণ্য পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে, যা পরিবহন খরচকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পাঠাতে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছে, তবে পরোক্ষভাবে তারাও বাড়তি খরচের চাপ অনুভব করছে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ৪০০তম গ্লোবাল ডেইরি ট্রেডের (জিডিটি) নিলামের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোয় খরচ বাড়া সত্ত্বেও দুগ্ধজাত পণ্য কেনার প্রবণতা বেড়েছে। অন্যদিকে প্রধান রফতানিকারক দেশগুলোয় দুধের উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। নিউজিল্যান্ডে গত ফেব্রুয়ারিতে দুধ উৎপাদনের নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রেও দুধের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ। দেশটিতে গত ৩০ বছরের মধ্যে বর্তমানে গবাদি পশুর সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আর্জেন্টিনা থেকেও দুধের উৎপাদন ১০ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধির খবর পাওয়া গেছে। আগামী এপ্রিল পর্যন্ত এ প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হলেও বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ প্রবৃদ্ধি বাজারের চাহিদাকে ছাপিয়ে যাওয়ার মতো নয়।

৩৯৯তম জিডিটি নিলামে দুধ ও দুগ্ধজাতীয় পণ্যের সরবরাহ বাড়লেও চাহিদা বেশ শক্তিশালী ছিল। বিশেষ করে স্কিম মিল্ক পাউডার (এসএমপি) বা ননি ছাড়া গুঁড়া দুধ, মাখন ও মোজারেলা পনিরের দাম এবং চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ সংকটের কারণে নন-ফ্যাট ড্রাই মিল্ক বা ননীমুক্ত গুঁড়া দুধের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাপী প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের প্রবণতা বাড়ায় ডেইরি পণ্যের বাজারে বেশ চাঙ্গা ভাব বজায় রয়েছে।

তবে রফতানির পরিমাণ বাড়লেও আয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। নিউজিল্যান্ডে রফতানির পরিমাণ বাড়লেও আয়ের হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। এর কারণ হিসেবে বছরের শুরুর দিকে পণ্যের দাম কম থাকাকে দায়ী করা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন পণ্যের রফতানি চিত্রেও ভিন্নতা রয়েছে। হোল মিল্ক পাউডার বা ননিযুক্ত গুঁড়া দুধ রফতানি বাড়লেও ননি ছাড়া গুঁড়া দুধ রফতানি অনেকটা কমেছে। অন্যদিকে ফ্যাট জাতীয় পণ্য অ্যানহাইড্রাস মিল্ক ফ্যাট (এএমএফ) যেমন মাখন, ঘি ও চিজের বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আমদানি-রফতানি চিত্রেও অসমতা লক্ষ করা গেছে। বিশ্বের অন্যতম বড় আমদানিকারক দেশ চীন বর্তমানে আমদানির পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে চীনের দুগ্ধজাত পণ্য আমদানির পরিমাণ প্রায় ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি বেড়েছে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। ইউরোপের দেশগুলোও নিজেদের রফতানি বাণিজ্য থেকে ভালো মুনাফা অর্জন করছে। তবে অস্ট্রেলিয়ার দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারে রফতানির পরিমাণ ও আয়—উভয় ক্ষেত্রেই ধস নেমেছে।

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য আগামী দিনগুলোয় বাজারে অনিশ্চয়তা বজায় রাখবে। পরিবহন ও বীমা খরচ বাড়তে থাকলে তা সাধারণ ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপের সৃষ্টি করবে। তবে আশার কথা হলো, উচ্চমূল্য সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা কমেনি, যা বাজারের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করছে। নিউজিল্যান্ডের বিশ্বখ্যাত ডেইরি কোম্পানি ফনটেরা এরই মধ্যে কৃষকদের জন্য দুধের দাম বাড়ানোর পূর্বাভাস দিয়েছে। সার্বিকভাবে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রতি দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..