ইউনেস্কো তালিকাভুক্ত কাঁচা-মাটির শহর ইয়াজ্দ। এটি শুধু শীতকালীন ভ্রমণের গন্তব্য নয়; বরং এক ধরনের আশ্রয়— যেখানে প্রাচীন স্থাপত্যের বুদ্ধিদীপ্ত নকশা শীতের ঠান্ডাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মাটির দেয়ালের ভেতর সূর্যের উষ্ণতা ধরে রাখে। মিডিয়া অ্যাকটিভিস্ট মালিহে ফাখারি এক নোটে লিখেছেন— ফেব্রুয়ারিতে ইয়াজ্দ ভ্রমণ সাধারণ কোনো সফর নয়; এটি জীবন্ত ইতিহাসের সঙ্গে এক সাক্ষাৎ— মিরাস আরিয়া জানিয়েছে।
ফাহাদানসহ ঐতিহাসিক মহল্লাগুলোর [সংকীর্ণ] আশ্তি-কোনান গলিতে হাঁটলে প্রথমেই যে বিষয়টি মন কেড়ে নেয়, তা হলো সেই স্থপতিদের প্রজ্ঞা—যারা শত শত বছর আগে, আধুনিক কোনো উপকরণ ছাড়াই, শহরের ইটের গঠনে জলবায়ুগত আরামের ধারণা বাস্তবায়ন করেছিলেন। এই মৌসুমে ইয়াজ্দ তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জাঁকজমকের এক প্রদর্শনী; যেখানে বাতাস ধরার মিনারগুলো (বাদগির), গ্রীষ্মের গরম বাতাস থেকে সাময়িক বিশ্রামে থাকলেও, এখনো শহরের আকাশরেখা জুড়ে তাদের মহিমা ছড়িয়ে আছে।
শীতকালে ইয়াজ্দের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যে দেখার মতো এক বৈজ্ঞানিক ও আকর্ষণীয় বিষয় হলো ‘তাপীয় জড়তা’ (thermal inertia)। কাদামাটি ও মাটির মতো পরিবেশবান্ধব উপকরণ, যাদের তাপধারণ ক্ষমতা বেশি, তারা মরুভূমির রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের কোমল উষ্ণতা নিজের ভেতরে সঞ্চয় করে এবং ঠান্ডা রাতে ধীরে ধীরে তা ঘরের ভেতর ছড়িয়ে দেয়।
এটাই সেই টেকসই ঐতিহ্য, যার খোঁজ আজ বিশ্ব করছে। এই মাসে ইয়াজ্দের ঐতিহাসিক কাঠামোর মাঝে কোনো পরিবেশবান্ধব আবাসনে থাকা মানে শুধু একটি কক্ষ বুক করা নয়; বরং এক হাজার বছরের পুরোনো এক ধরনের জীবপ্রযুক্তির অভিজ্ঞতা অর্জন করা।
ইয়াজ্দের সাবাতগুলো (কাঁচা-মাটির তৈরি ছায়াঘেরা পথ) শীতকালে নতুন ও আকর্ষণীয় ভূমিকা পায়। গ্রীষ্মে ছায়া দেওয়ার জন্য পরিচিত এসব কাঠামো শীতের দিনে মাটির তাপ বেরিয়ে যেতে বাধা দেয় এবং পথচারীদের জন্য উষ্ণ করিডোর তৈরি করে। এখানে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে আছে। সাবাতের নিচ দিয়ে সাইকেল যাওয়ার শব্দ, কিংবা স্যাঁতসেঁতে গলির বাতাসে ভেসে আসা স্থানীয় তাফতুন রুটির গন্ধ— সবই সেই অদৃশ্য ঐতিহ্যের অংশ, যা বাহমান মাসে (জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি) আবার প্রাণ ফিরে পায়।
অন্যদিকে, শীতকালে ইয়াজ্দ নারীদের ও পুরুষদের সৃজনশীল হাতের কাজের এক জীবন্ত প্রতিফলন— যারা তেরমেহ (সূক্ষ্ম ও মূল্যবান ঐতিহ্যবাহী নকশার কাপড়) এবং দারাইয়ি (রং করা সুতা বুনে তৈরি এক ধরনের কাপড়)-এর বুননে ভালোবাসার উষ্ণতা জড়িয়ে দেন।
দীর্ঘ শীতের রাতগুলোতেও ইয়াজ্দের হস্তশিল্প সমানভাবে বিকশিত হয়। ঐতিহাসিক বয়নকেন্দ্রের আরামদায়ক কর্মশালায় বসে ঐতিহ্যবাহী তাঁতের পাশে সময় কাটানো নিজেই এক অভিজ্ঞতাভিত্তিক পর্যটন। এই রাতগুলোকে মাঝখানে আঙিনা ও ফিরোজা রঙের জলাধারযুক্ত বাড়ির অন্তরঙ্গ আড্ডার সঙ্গে মিলিয়ে দিলে রন্ধন পর্যটনকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ তৈরি হয়।
আশ-শুলি (ইয়াজ্দি এক ধরনের স্যুপ) ও ইয়াজ্দি কফি কেবল খাবার নয়; এগুলো এই ভূমির ঐতিহাসিক পরিচয়ের অংশ, যা মরুভূমির কাঁপানো ঠান্ডায় পর্যটকদের উষ্ণ রাখে।
ইউনেস্কো নিবন্ধিত ইয়াজ্দ আমাদের কাঁধে এক বড় দায়িত্ব দিয়েছে— এই জীবন্ত কাঠামো সংরক্ষণ করার। ব্যাপক পর্যটনের চাপে ইয়াজ্দের পরিচয় যেন হারিয়ে না যায়। শীতকালীন পর্যটন উন্নয়নকে দায়িত্বশীল পর্যটনের পথে এগোতে হবে; অর্থাৎ এর ঐতিহ্যের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হবে, কিন্তু এর নাজুক দেহের ক্ষতি না করে।
ইয়াজ্দকে বারবার নতুন করে পড়তে হবে, যেন নতুন প্রজন্ম প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান শিখতে পারে এবং এমন এক সভ্যতা গড়ে তুলতে পারে, যা হাজার বছর ধরে মরুভূমির বুকে দৃঢ়ভাবে টিকে আছে।
শেষ পর্যন্ত ফেব্রুয়ারিতে ইয়াজ্দ শুধু মানচিত্রের একটি বিন্দু নয়; এটি এক অনুভূতি। উঁচু কাঁচা-মাটির দেয়ালের আলিঙ্গনে নিরাপত্তার অনুভূতি, আর এমন এক শহরে প্রশান্তির অনুভূতি—যেখানে কোনো তাড়াহুড়ো নেই।
এই মৌসুমে ইয়াজ্দ মানে নিজের কাছে ফিরে যাওয়ার সেরা প্রস্তাব, আর সেই সৌন্দর্য দেখার সুযোগ— যার মুখে সময় কোনো ধুলো জমাতে পারেনি। এ বছর শীত কাটানো উচিত ইয়াজ্দেই; যেখানে ইতিহাস, গরম চা আর মরুভূমির মানুষের হাসি আপনাকে দেবে সবচেয়ে উষ্ণ স্বাগত।
সূত্র: তেহরান টাইমস
এ জাতীয় আরো খবর..