আদানির বিদ্যুৎ থেকে পানিপথের শক্তি: বাংলাদেশের বিদ্যুৎখাতে নির্ভরশীলতা বনাম সার্বভৌমত্ব

মোঃ সাইফুল আলম তালুকদার

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০২-০৪, | ২২:৩৬:৪১ |
বাংলাদেশের বিদ্যুৎখাত আজ যে গভীর সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তার একটি প্রতীকী নাম হয়ে উঠেছে ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি। এই প্রকল্পটি শুধু একটি ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ আমদানির উদাহরণ নয়; এটি রাষ্ট্রের আর্থিক সার্বভৌমত্ব, নীতিনির্ধারণের সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন দর্শনের ওপর একাধিক স্তরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিদ্যুৎ না থাকলে যেমন উন্নয়ন থেমে যায়, তেমনি ভুল চুক্তির বিদ্যুৎ একটি দেশকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দিতে পারে, আদানি প্রকল্প সেই বাস্তবতারই একটি দৃষ্টান্ত।

এই চুক্তির মূল সমস্যা শুরু হয় এর কাঠামো থেকেই। বাংলাদেশ এখানে বিদ্যুৎ আমদানি করছে একটি নির্দিষ্ট দামে, দীর্ঘমেয়াদি ‘টেক অর পে’ শর্তে। অর্থাৎ দেশটির প্রকৃত বিদ্যুৎ চাহিদা থাকুক বা না থাকুক, নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতেই হবে। ফলে যখন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উদ্বৃত্ত থাকে, তখনও বাংলাদেশকে ‘আইডল ক্যাপাসিটি’র জন্য ডলার গুনতে হয়। এটি কেবল আর্থিক অযৌক্তিকতা নয়; এটি একটি পরিকল্পিত ফাঁদ, যেখানে ঝুঁকি পুরোপুরি ক্রেতা রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই চুক্তির আরেকটি গুরুতর দিক হলো মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতার অভাব। আদানি প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য আঞ্চলিক ও দেশীয় বিকল্পগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অথচ বাংলাদেশে গ্যাসভিত্তিক, কয়লাভিত্তিক এমনকি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা ছিল এবং এখনো আছে, যেগুলোর গড় খরচ তুলনামূলকভাবে কম। তবুও নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট বিদেশি করপোরেট গোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যা প্রতিযোগিতামূলক বাজারনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রকল্পের আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ জনগণের ওপর। বিদ্যুতের উচ্চ ক্রয়মূল্য সামাল দিতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যার অর্থ জাতীয় কোষাগার থেকে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। এই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু অভিযোজন বা অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা যেত। বাস্তবে তা হচ্ছে না, কারণ একটি চুক্তি আমাদের আর্থিক অগ্রাধিকারগুলোকে কার্যত জিম্মি করে ফেলেছে।

ডলার সংকটের সময় এই প্রকল্পের কুফল আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিদ্যুৎ আমদানির বিল পরিশোধ করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব পড়ে আমদানি, মুদ্রাস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। একদিকে শিল্প খাত ডলার সংকটে কাঁচামাল আনতে হিমশিম খায়, অন্যদিকে রাষ্ট্রকে বাধ্যতামূলকভাবে একটি নির্দিষ্ট বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতেই হয়। এটি অর্থনীতির ভেতরে একটি অসাম্য ও অগ্রাধিকারহীনতার চিত্র তুলে ধরে।

এখানে আরেকটি নৈতিক প্রশ্নও উঠে আসে। আদানি প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরোক্ষভাবে ভারতের একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর কাঠামো, ঋণ পরিশোধ এবং ব্যবসায়িক ঝুঁকির অংশীদার হয়ে যাচ্ছে, অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। এটি উন্নয়ন সহযোগিতা নয়; এটি নির্ভরশীলতার এক নতুন রূপ, যেখানে রাষ্ট্রের স্বার্থ করপোরেট স্বার্থের নিচে স্থান পায়।

এই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও গভীর। এটি দেশীয় বিদ্যুৎখাতের উদ্ভাবন ও বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে। যখন নীতিনির্ধারকরা জানেন যে উচ্চমূল্যের আমদানিকৃত বিদ্যুৎ যেকোনো অবস্থায় কিনতেই হবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই নবায়নযোগ্য শক্তি, দক্ষ গ্রিড বা দেশীয় জ্বালানি ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। ফলে একটি ভুল সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের বহু সম্ভাবনাকে আগেই হত্যা করে দেয়।

আদানি প্রকল্প তাই শুধু একটি চুক্তি নয়; এটি একটি দর্শনের প্রতিফলন। যেখানে স্বল্পমেয়াদি সুবিধা, রাজনৈতিক সুবিধা কিংবা কূটনৈতিক সমীকরণ দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে ছাপিয়ে যায়। আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন বিদ্যুৎখাতে একটি মৌলিক পুনর্বিবেচনা। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎস, বিশেষ করে নবায়নযোগ্য শক্তি ও সমন্বিত অবকাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। অন্যথায়, এই ধরনের প্রকল্প একের পর এক আমাদের অর্থনীতিকে নিঃশব্দে রক্তক্ষরণ করতেই থাকবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল এবং সহজ। বাংলাদেশ কি বিদ্যুৎ কিনে টিকে থাকতে চায়, নাকি নিজের ভূগোল, সম্পদ ও জনগণের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শক্তি উৎপাদনের সার্বভৌম অধিকার ফিরে পেতে চায়? আদানি প্রকল্পের অভিজ্ঞতা আমাদের স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছে, ভুল পথের মূল্য কতটা দাম দিতে হতে পারে।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে বিদেশি, ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ আমদানির বিকল্প কী? উত্তরটি খুব দূরে নয়; এটি আমাদের চোখের সামনেই, বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় নিহিত। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে নদী, খাল ও সেচ নেটওয়ার্ক কেবল পানির প্রবাহ নয়, বরং সম্ভাব্য অবকাঠামোগত জীবনরেখা। এই পানিপথগুলোকে যদি পরিকল্পিতভাবে “ইনফ্রাস্ট্রাকচার করিডোরে” রূপান্তর করা যায়, তবে বিদ্যুৎ সমস্যার একটি বড় অংশ কাঠামোগতভাবেই লাঘব করা সম্ভব।

ইনফ্রাস্ট্রাকচার করিডোর বলতে এখানে কেবল একটি পরিবহন পথ বা আলাদা কোনো প্রকল্প বোঝানো হচ্ছে না। এটি একটি মাল্টি-ইউটিলিটি ধারণা, যেখানে একই ভৌগোলিক লাইনে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন, পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি সহায়তা, খাদ্য উৎপাদন এবং ডিজিটাল সংযোগ একসঙ্গে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ একবার বিনিয়োগ করে রাষ্ট্র একাধিক সমস্যার সমাধান পায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পানিপথ এই করিডোরের জন্য সবচেয়ে যৌক্তিক মাধ্যম, কারণ এতে নতুন জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমে, পরিবেশগত ক্ষতি সীমিত থাকে এবং গ্রামীণ এলাকাকে উন্নয়নের মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করা যায়।

এই ধারণা বাস্তবায়নের প্রথম শর্ত হলো খাল ও নদীগুলোর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন। বর্তমানে দেশের খাল ব্যবস্থার বড় সমস্যা হচ্ছে ভরাট, দখলদারি এবং অনিয়ন্ত্রিত প্রস্থ ও গভীরতা। যতক্ষণ পর্যন্ত একটি খালের প্রস্থ, গভীরতা ও দু’পাশের সার্ভিস জোন নির্ধারিত না হয়, ততক্ষণ তার ওপর কোনো স্থায়ী অবকাঠামো টেকসই হয় না। তাই খাল ও নদীগুলোকে প্রধান, সংযোগকারী ও স্থানীয় এই তিন স্তরে শ্রেণিবদ্ধ করে প্রতিটির জন্য ন্যূনতম প্রকৌশল মান নির্ধারণ করাই হবে করিডোর মডেলের ভিত্তি। এটি একদিকে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে পরবর্তী বিদ্যুৎ ও ডেটা অবকাঠামোর নিরাপত্তা দেবে।

এই ভিত্তির ওপরেই আসে খালের ওপর সৌর ক্যানোপি ব্যবস্থা। খালের দুই পাড়ে পিলার স্থাপন করে তার ওপর ঝুলন্ত কাঠামোর মাধ্যমে সোলার প্যানেল বসানো হলে জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই বড় আকারে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়। পানির ওপর সোলার বসানোর ফলে বাষ্পীভবন কমে, পানির তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে এবং প্যানেলের দক্ষতাও বৃদ্ধি পায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিদ্যুৎ দেশীয়, নবায়নযোগ্য এবং ডলারনির্ভর নয়। দীর্ঘমেয়াদে এর ইউনিট খরচ আমদানিকৃত বিদ্যুতের তুলনায় অনেক কম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, যা সরাসরি ভর্তুকি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমাতে সহায়ক হবে।

ইনফ্রাস্ট্রাকচার করিডোরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায় উপেক্ষিত দিক হলো পানিপথভিত্তিক স্মার্ট অ্যাকুয়াকালচার। খাল কেবল পানি বহনের মাধ্যম নয়; সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি একটি উচ্চফলনশীল প্রোটিন উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে। খালের নির্দিষ্ট অংশে নিয়ন্ত্রিত মাছ চাষ, সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ফিড ব্যবস্থাপনা যুক্ত হলে উৎপাদন বহুগুণ বাড়ে। এর ফলে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং খাদ্য আমদানির চাপ কমে। বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে এর সম্পর্ক এখানেই, যখন কৃষি ও খাদ্য খাত শক্তিশালী হয়, তখন সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বিদ্যুৎ ভর্তুকির চাপ বহন করার সক্ষমতাও বাড়ে।

এই করিডোর মডেলের সবচেয়ে কৌশলগত অংশ হলো খালের ধারেই ফাইবার অপটিক ও পাওয়ার ডাক্ট স্থাপন। পানিপথের পাশে কেবল বসানো তুলনামূলকভাবে সহজ, দখল ঝুঁকি কম এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও সীমিত। একবার পরিকল্পিতভাবে এই নেটওয়ার্ক বসানো গেলে ২০ থেকে ২৫ বছর আলাদা করে খননের প্রয়োজন পড়ে না। এর মাধ্যমে স্মার্ট গ্রিড, রিমোট মনিটরিং এবং বিকেন্দ্রীকৃত বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা সম্ভব হয়, যা লোডশেডিং ও সিস্টেম লস কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

ইনফ্রাস্ট্রাকচার করিডোর কেবল উৎপাদন নয়, নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকেও একত্র করে। স্মার্ট গেট, রিমোট কন্ট্রোল স্লুইস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থার মাধ্যমে পানি কখন ধরে রাখা হবে, কখন ছাড়া হবে সেটি আগেই নির্ধারণ করা যায়। এর ফলে কৃষি ক্ষতি কমে, গ্রিড স্থিতিশীল থাকে এবং দুর্যোগ পরবর্তী বিদ্যুৎ সংকটের তীব্রতা হ্রাস পায়।

তবে এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রকৌশল নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক। পানি, বিদ্যুৎ, আইসিটি ও স্থানীয় সরকার এই খাতগুলো এখন আলাদা আলাদা সিদ্ধান্তে চলে। একদিকে খাল খনন হয়, অন্যদিকে সেটি ভরাট হয়, আরেকদিকে ফাইবার কেটে যায়। এই বিশৃঙ্খলা দূর করতে একটি সার্বভৌম পানি ও শক্তি কর্তৃপক্ষ গঠন ছাড়া বিকল্প নেই, যেখানে সব সংশ্লিষ্ট সংস্থা এক ছাতার নিচে সমন্বিতভাবে কাজ করবে।

অর্থায়নের প্রশ্নেও এই মডেল বাস্তবসম্মত। বর্তমানে কুইক রেন্টাল ও উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ আমদানিতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার একটি অংশ পুনর্নির্দেশ করলেই প্রাথমিক বিনিয়োগ সম্ভব। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে গ্রিন বন্ড, ইসলামিক সুকুক, জলবায়ু অর্থায়ন এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ। অর্থাৎ এটি কল্পনাভিত্তিক নয়, বরং বিদ্যমান অর্থনৈতিক প্রবাহ পুনর্বিন্যাসের একটি প্রস্তাব।

সব মিলিয়ে ইনফ্রাস্ট্রাকচার করিডোর মানে কেবল নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়; এটি একটি দর্শনগত পরিবর্তন। যেখানে পানি, শক্তি, খাদ্য ও ডেটা আলাদা খাত নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। এই পথে হাঁটলে আদানির মতো ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ চুক্তির ওপর নির্ভরতা কমবে, ডলারের চাপ হ্রাস পাবে এবং ভর্তুকিনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বাইরে আসার সুযোগ তৈরি হবে। শেষ পর্যন্ত এটি বিদ্যুৎ সংকটের সাময়িক সমাধান নয়, বরং শক্তি সার্বভৌমত্বের দিকে একটি কাঠামোগত পদক্ষেপ।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..

Dhaka Forecast & Prayer Schedule

--°C
Loading...
💧 Humidity
--%
🌬 Wind
-- km/h

3-Day Forecast

Prayer Time

🕌 Fajr 🕌 Dhuhr
-- --
🕌 Asr 🕌 Maghrib
-- --
🕌 Isha
--
Loading countdown…
দেশ ও মুদ্রা ১ ইউনিট = টাকা পরিবর্তন
⏳ Currency data loading...