আইসিসি কি দিনে দিনে নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলছে? তার আগে একটি গল্প বলি শুনুন।
একদিন হিটলার একটি মুরগি হাতে নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এলেন। তিনি মুরগিটির মাথাটা বগলের নিচে শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে তিনি মুরগিটির পালক একে একে ছিঁড়তে শুরু করলেন। মুরগিটি যন্ত্রণায় চিৎকার করছিল এবং হিটলারের হাত থেকে বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে ছটফট করছিল। কিন্তু হিটলার তাকে ছাড়লেন না, বা তার চিৎকারে কোনো মনোযোগও দিলেন না, তিনি শুধু পালক ছিঁড়তেই থাকলেন।
মন্ত্রিসভার সদস্যরা তাকে বললেন: “এই নিরীহ প্রাণীটাকে এভাবে কষ্ট দেবেন না। ওকে ছেড়ে দিন।”
কিন্তু হিটলার কারো কথা শুনতে রাজি হলেন না।
অবশেষে, সব পালক ছিঁড়ে ফেলার পর তিনি মুরগিটিকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেললেন। তারপর তিনি পকেট থেকে কিছু শস্যদানা বের করে মুরগিটিকে খাওয়াতে শুরু করলেন। সেই অবস্থায়, খাবারের জন্য মরিয়া হয়ে মুরগিটি আবার হিটলারের হাতের দিকে তাকাতে শুরু করল।
হিটলার শস্যদানা দেখিয়ে তাকে কাছে ডাকলেন। কিছুক্ষণ পর মুরগিটি এসে তার পাশে বসলো এবং সেই কয়েকটি দানা খেতে লাগল। যে মুরগিটি এতক্ষণ হিটলারের হাত থেকে বাঁচার জন্য ছটফট করছিল, সেই মুরগিটিই এখন আবার তার পাশে এসে বসলো মাত্র কয়েকটি শস্যদানার জন্য।
এখানে হিটলার হল ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল এবং আইসিসি (আগে আইসিসিতে ১২টি দেশের মতামত গ্রাহ্য করা হতো, এরপর আসলো বিগ-থ্রি আর ২০১৫ সালের পর থেকে পুরোটাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড চালাচ্ছে) আর মুরগিটি হচ্ছে আইসিসির বাকি দেশগুলো!
আইসিসির বিরুদ্ধে আলোচিত দুর্নীতি ও বিতর্কের ক্ষেত্রগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করলাম:
১) আর্থিক ক্ষমতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ:
তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো
ক্রিকেট পরিচালনায় “এক দেশ, এক ভোট” নীতির বদলে কার্যত “এক দেশ, বেশি টাকা, বেশি ক্ষমতা” মডেল চালু হওয়া। বিশেষ করে ভারতীয় বোর্ডের বিপুল আয়ের কারণে সূচি, টুর্নামেন্ট, আইন ও শাস্তিতে প্রভাব পড়ে বলে অভিযোগ আছে।
২) রাজস্ব বণ্টনে চরম বৈষম্য:
ভারত আইসিসির অর্জিত রাজস্ব থেকে ৩৮.৫% নিয়ে নেয়। যেটা বিশ্বের অন্য কোন খেলাধুলার ক্ষেত্রে একতরফা ভাবে হয় না। বাংলাদেশের হিস্যা এক্ষেত্রে ২.৫% এরও কম। তাহলে ভেবে দেখুন, ছোট ও উদীয়মান দেশগুলোর কি অবস্থা। ফুটবল বিশ্বকাপে ছোট-বড় সব দেশগুলো সমান অংশগ্রহণ ফি পেয়ে থাকে, যেখানে এটা ক্রিকেটে কল্পনাই করা যায় না আর এই কারণে ক্রিকেট মাত্র কয়েকটি দেশের গণ্ডিতে আটকে আছে। এমনকি এটি অলিম্পিকের মত বিশ্ব দরবারে ব্রাত্য। এটাকে তাই অনেকেই “স্ট্রাকচারাল করাপশন” বলেন।
৩) আইপিলকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া:
বিশ্বের সব দেশের (পাকিস্তান বাংলাদেশ ব্যতীত; হ্যাঁ বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ ১-২ জনকে এই সুযোগ দেয়া হয়) খেলোয়াড়দেরকে আইপিএলে খেলার সুযোগ করে দেবার জন্য আইসিসি তাদের ক্যালেন্ডারে বিশেষ সময় বরাদ্দ রেখেছে। যেটা অন্যায়, কারণ অন্য দেশের ঘরোয়া টুর্নামেন্টের জন্য আইসিসি কিন্তু সময় বরাদ্দ করে না বা খেলোয়াড়দেরকে 'নো অবজেকশন সার্টিফিকেট' প্রদানে উৎসাহ দেয় না। এই সুযোগে আইপিএল আইসিসির ৪০% আয়ে ভূমিকা রাখছে। তাহলে আইসিসি কি এখানে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলো? তাদের নিশ্চয়ই কোনো নির্দিষ্ট লিগের রক্ষক হওয়া উচিত নয়।
৪) শাস্তি প্রদানে দ্বিচারিতা:
অভিযোগ আছে যে ভারতের খেলোয়াড়রা বল টেম্পারিং, স্লো ওভার রেট, আচরণবিধি ভঙ্গের ক্ষেত্রে বহুবার আইসিসি থেকে নিষেধাজ্ঞা পাওয়া থেকে উতরে গেছে। রবীন্দ্র জাদেজার ২০২৩ সালের বল টেম্পারিং বা হরভজন সিংয়ের ২০০৮ সালের বর্ণবাদী মন্তব্য উল্লেখযোগ্য।
৫) পিচ ও হোম কন্ডিশন নিয়ে চোখ বন্ধ রাখা:
ভারতের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টার্নিং বা অস্বাভাবিক পিচ তৈরি করতে সাহায্য করা এমনকি কিউরেটর ও বোর্ডের সরাসরি হস্তক্ষেপের বিষয়ে আইসিসি প্রায়ই নীরব থাকে, যেখানে অন্য দেশ হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
৬) বিশ্বকাপ গ্রুপিং ও ফিক্সচার ম্যানিপুলেশন:
বিশ্ব র্যাঙ্কিং উপেক্ষা করে গ্রুপ সাজানো। যেমন এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কোনভাবেই ভারত পাকিস্তানের এক গ্রুপে থাকার কথা নয় (এবারের বিশ্বকাপে পাকিস্তানের থাকার কথা ছিল গ্রুপ-সি তে, ভারতের সাথে একসাথে গ্রুপ-এ তে থাকবার কথা ছিল না)। শুধুমাত্র ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ থেকে এবার ২৫০ মিলিয়ন ডলার আয় করবার জন্য এই দুটি বৈরী দেশকে এক গ্রুপে রাখা হয়েছে। অথচ তাদের মধ্যে টেস্ট ম্যাচ অন্ততপক্ষে নিরপেক্ষ দেশে আয়োজন করার জন্য আইসিসি নীরব থাকে। শুধু এই বিশ্বকাপেই নয় আইসিসির যে কোন বড় টুর্নামেন্টে এই দুটি দেশকে একসাথে রাখা হয় মুনাফা অর্জনের জন্য। তাহলে আইসিসির কাজ কি শুধুই মুনাফা অর্জন করা? নাকি সেটা হওয়া উচিত ছিল এই দুটি দেশের মধ্যে খেলা বিভিন্ন সময় নিয়মিতভাবে আয়োজন করা এবং খেলাটিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া।
৭) নিরাপত্তা ও ভেন্যু সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব:
বাংলাদেশের মতো দেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি উপেক্ষা করতে পারে আইসিসি, আবার ভারতের জন্য তারা ঠিক যেভাবে চাইবে সেভাবেই ম্যাচ আয়োজন করতে আইসিসি সদা তৎপর। এতে বোঝা যায় সিদ্ধান্তগুলো সবসময় কেবল খেলোয়াড় নিরাপত্তার ওপর ভিত্তি করে নেয়া হয় না। নেয়া হয় কেবলমাত্র পয়সা কামাবার জন্য। শুধু কি তাই, ক্রিকেট খেলা দেখতে আসতে ইচ্ছুক দেশগুলোর নাগরিকদের ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রদানে ভারত এগিয়ে।
৮) প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব:
সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ, বোর্ড মিটিংয়ের বিস্তারিত প্রকাশ না করা এবং স্বাধীন অডিট ও জবাবদিহির ঘাটতি আইসিসির বিরুদ্ধে একটি নিয়মিত অভিযোগ। সেই সাথে যোগ করুন ২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচটিতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের আপত্তিতে ডিআরএস প্রযুক্তি বাতিল করা বা বিভিন্ন সময় অন্য ভেন্যুতে ভারতের খেলতে চাওয়াতে সায় দেয়া কি আইসিসির স্বেচ্ছাচারিত নয়?
৯) ক্রিকেট খেলা কে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে অনীহা:
আইপিএল থেকে যদি পয়সা আসে তাহলে তার মত করে বিশ্বের অন্যান্য দেশ বা অঞ্চলেও আইসিসি ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট খেলার জন্য সকল দেশকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। ফুটবলের মত ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, স্প্যানিশ লালিগা, ইতালিয়ান সিরি-আ বা জার্মান বুন্দেসলিগার মত অর্থ উপার্জনকারী লিগ আয়োজনে তাদের আগ্রহ নেই।
১০) উদীয়মান ক্রিকেট জাতিগুলোর প্রতি অবহেলা:
টেস্ট মর্যাদা প্রদান, এক দেশের সাথে অন্য দেশের খেলার ফিক্সচার প্রণয়ন ও অর্থায়নে ধারাবাহিক বৈষম্য দেখিয়ে আসছে আইসিসি। বেশি বেশি পয়সা কামানোর উদ্দেশ্যে এবং খেলোয়াড়দের বিভিন্ন রকম ফরমেটে খেলার জন্য শারীরিকভাবে ফিট রাখার অভিপ্রায়ে ক্রমান্বয়ে টেস্ট ম্যাচ খেলার সংখ্যা কমে আসছে, ফলে টেস্ট খেলুড়ে দেশের সংখ্যা বাড়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। এমনকি, দুর্বল দেশের সাথে সবল দল গুলোর খেলার সময় বড় দলের ম্যাচে বিতর্কিত সিদ্ধান্তে আইসিসির আম্পায়ারিং প্রায়ই ভুল হলেও অদ্ভুতভাবে একমুখী হয় বলে অভিযোগ আছে।
আইসিসির কার্যত একটি দেশের বোর্ড হিসেবে কাজ করছে যেখানে সাধারণ ক্রিকেট জাতিগুলোর কণ্ঠস্বর খুব দুর্বল। তাই আইসিসির বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হলো, এটি আর পুরোপুরি ক্রিকেটের নৈতিক অভিভাবক নয়, বরং একটি বাজারনির্ভর কর্পোরেট কাঠামোতে পরিণত হয়েছে, যেখানে অর্থ, সম্প্রচার ও শক্তিশালী ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের স্বার্থ দেখাই তাদের একমাত্র এবং প্রধান কর্তব্য।
ক্রিকেট এখনো সুন্দর ও ভদ্র লোকের খেলা কিন্তু এর শাসনব্যবস্থা ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বিগত বছরগুলোতে।
এ জাতীয় আরো খবর..