বিশ্বে ধনী-দরিদ্র বৈষম্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দাতব্য সংস্থা অক্সফামের নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ১২ জন ধনকুবেরের হাতে যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তা মানবজাতির দরিদ্রতম অর্ধেক মানুষের মোট সম্পদের চেয়েও বেশি। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ধনকুবেরদের সম্মিলিত সম্পদ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং এতে বড় ভূমিকা রেখেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিমালা। এই চরম বৈষম্য ভবিষ্যতে গুরুতর রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে বলেও সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছে অক্সফাম।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, বৈশ্বিক অভিজাতরা যখন সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে অংশ নিতে জড়ো হচ্ছেন, তখনই প্রকাশ পেল এই প্রতিবেদন। দাতব্য এই সংস্থাটি সতর্ক করেছে, ধনী ও গরিবের মাঝে এই চরম বৈষম্য ভবিষ্যতে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ রাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অক্সফাম জানায়, ২০২৫ সালে বিশ্বের ধনকুবেরদের সম্মিলিত সম্পদ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই অতিধনীদের সম্পদ ১৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে মোট ১৮ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সংস্থাটির মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগুলোই মূলত এই বিপুল সম্পদ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণে জোর দেয়া এবং করপোরেট কর বাড়ানোর আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলো দুর্বল করে দেয়ায় বিশ্বের ধনীদের আরও লাভবান হতে দেখা গেছে।
অক্সফাম বলছে, এই প্রথমবারের মতো বিশ্বে ধনকুবেরের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্কের নেতৃত্বে শীর্ষ ১২ জন ধনকুবেরের সম্পদ এখন মানবজাতির দরিদ্রতম অর্ধেক— অর্থাৎ চার শত কোটির বেশি মানুষের মোট সম্পদের চেয়েও বেশি।
সংস্থাটি আরও জানায়, এই বিপুল অর্থ ক্রমেই রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে ধনকুবেরদের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম কেনার প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করেছে অক্সফাম। যেমন, ইলন মাস্কের এক্স (সাবেক টুইটার) অধিগ্রহণ বা অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট কেনার ঘটনা।
অক্সফামের নির্বাহী পরিচালক অমিতাভ বেহার বলেন, ‘ধনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান এই বৈষম্য এক ধরনের রাজনৈতিক ঘাটতি তৈরি করছে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক’।
এদিকে দাভোস সম্মেলনে অংশ নিতে ট্রাম্প এবার যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম বড় একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে যাচ্ছেন। আয়োজকদের ভাষায়, সম্মেলনের এ বছরের মূল প্রতিপাদ্য ‘সংলাপের চেতনা’। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পই আলোচনার বড় অংশ দখল করে নেবেন।
অন্যদিকে ট্রাম্পের অংশগ্রহণের খবরে দাভোসে রোববার প্রায় ৩০০ জন বিক্ষোভকারী জড়ো হন। অনেকেই ইলন মাস্ক বা মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মুখোশ পরে হাতে ইউরো নোট নিয়ে প্রতিবাদ করেন।
সুইস ইয়াং সোশ্যালিস্টসের নেত্রী নাথালি রুওস এএফপিকে বলেন, দাভোসে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষরা এমন সব সিদ্ধান্ত নেন, যা সবার জীবনকে প্রভাবিত করে। তিনি বলেন, ‘তারা এটা করেন কোনও ধরনের গণতান্ত্রিক বৈধতা ছাড়াই। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম যদি ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ‘ফ্যাসিস্টদের’ স্বাগত জানায়, তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।’
অক্সফামের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত ন্যূনতম ১৫ শতাংশ করহার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে অব্যাহতি দেয়ার সিদ্ধান্ত বৈষম্য বাড়ার বিষয়টিকে উপেক্ষার একটি বড় উদাহরণ। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধনকুবেররা শুধু অঢেল সম্পদই জমাচ্ছেন না, সেই সম্পদ ব্যবহার করে রাজনৈতিক ক্ষমতাও কুক্ষিগত করছেন, যেন অর্থনীতির নিয়মকানুন নিজেদের মতো করে গড়ে তুলতে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব খাটাতে পারেন তারা।
অক্সফাম সতর্ক করে বলেছে, এই ধরনের ক্ষমতা ধনকুবেরদের আমাদের সবার ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিচ্ছে। আর এটি মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করছে এবং সাধারণ মানুষের অধিকার দুর্বল করে দিচ্ছে।
এ জাতীয় আরো খবর..