ট্রাম্প কেন হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারছেন না

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-১৯, | ১২:৫৬:৫৪ |
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বিশ্বের দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বৈশ্বিক তেলের দাম বাড়ার প্রেক্ষাপটে তিনি এটিকে ইরানের অবরোধ ভাঙার জন্য একটি যৌথ দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন।

১৩ মার্চ দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জাপান, এমনকি চীনকেও তার তথাকথিত ‘আর্মাডা’তে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তবে এই আহ্বানে তেমন ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। 

এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনীও এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।

ভৌগোলিক বাস্তবতা এখানে বড় বাধা। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০-৩০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়। এর এক পাশে ইরান এবং অন্য পাশে ওমান। সবচেয়ে সরু জায়গায় এর প্রস্থ মাত্র ৩৪ কিলোমিটার আর জাহাজ চলাচলের পথ মাত্র ৪ কিলোমিটার করে, যা নিরাপদভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন।

মার্কিন বিমানবাহী রণতরী যা নিমিটজ শ্রেণির জাহাজ, এই সংকীর্ণ এলাকায় কার্যকরভাবে চলাচল করতে হিমশিম খায়। বড় জাহাজ ঘোরাতে কয়েক কিলোমিটার জায়গা লাগে, যা এখানে প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে ইরানের উঁচু ভূখণ্ড থেকে ট্রাকভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সহজেই আক্রমণ চালানো যায়।

নৌ-মাইন এখনো সবচেয়ে সস্তা ও কার্যকর প্রতিরোধ অস্ত্র। ইরানের কাছে হাজার হাজার মাইন রয়েছে, যা দ্রুতগতির নৌকা বা ছোট সাবমেরিন দিয়ে স্থাপন করা যায়। অতীতে মার্কিন অভিযানগুলো আংশিকভাবে জাহাজ চলাচল সচল রাখলেও পুরো নিয়ন্ত্রণ কখনোই প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

২০২৬ সালের শুরুতে ট্রাম্পের আর্মাডা মোতায়েনও একই বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি, ক্ষমতার প্রদর্শন থাকলেও হরমুজের প্রাকৃতিক ঝুঁকি কাটিয়ে ওঠা যায়নি। পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ইরানের প্রায় ১ হাজার ৬০০ মাইল উপকূলজুড়ে আকাশ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, যা হাজার হাজার বিমান অভিযানের মাধ্যমে সম্ভব এবং তা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই নয়।

ইরানের সামরিক সক্ষমতাও শক্তিশালী। তাদের রয়েছে বহুস্তরবিশিষ্ট প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যা বিশেষভাবে হরমুজ অঞ্চলের জন্য তৈরি। হাজার হাজার অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল ও ব্যালিস্টিক মিসাইল রয়েছে, যা উপকূলের গোপন ঘাঁটি থেকে ছোড়া যায়।

এ ছাড়া ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের নৌবাহিনীর ২০ হাজারের বেশি দ্রুতগতির ছোট নৌকা রয়েছে, যা ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ চালাতে পারে। ২০০২ সালের একটি সামরিক মহড়ায় এই কৌশলে একটি মার্কিন যুদ্ধগোষ্ঠী ধ্বংস করার সিমুলেশনও দেখানো হয়েছিল।

ইরানের সাবমেরিনবহরও উল্লেখযোগ্য। কিলো শ্রেণির সাবমেরিন ও ছোট আকারের ঘাদির সাবমেরিন উপসাগরের অগভীর পানিতে সহজেই লুকিয়ে থাকতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাতেও এই চিত্র দেখা গেছে। খার্গ দ্বীপে মার্কিন হামলার পরও ১৪ মার্চ কোনো তেলবাহী জাহাজ নিরাপদে চলাচল করতে পারেনি। বরং ইরানের নৌবাহিনী তাদের হয়রানি করেছে।

অন্যদিকে প্রতিদিন ৬০টির বেশি তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়া একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজসংখ্যা সীমিত এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের দায়িত্ব ছড়িয়ে রয়েছে। রসদ সরবরাহের জন্য বাহরাইনের মতো ঘাঁটির ওপর নির্ভর করতে হয়, যা নিজেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায়। ফলে এই সরবরাহব্যবস্থাও ঝুঁকিপূর্ণ।

ট্রাম্পের বহুজাতিক জোট গঠনের আহ্বানে কার্যত কোনো বড় দেশ এগিয়ে আসেনি। উপসাগরীয় দেশগুলো, যেমন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, নিজেদের স্থাপনাগুলো আরও হামলার ঝুঁকিতে ফেলতে চায় না।
ইউরোপ ও জাপানও কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কাল্লাস বলেছেন, ‘কেউই তাদের মানুষকে ঝুঁকিতে ফেলতে প্রস্তুত নয়। আমাদের কূটনৈতিক উপায়ে এই পথ খোলা রাখতে হবে, না হলে খাদ্য, সার ও জ্বালানিসংকট তৈরি হবে।’

ট্রাম্পের ‘আর্মাডা’তে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডের মতো জাহাজ রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ডেস্ট্রয়ার, ক্রুজার ও সাবমেরিন। কিন্তু এই শক্তিশালী বাহিনীও হরমুজের বাস্তবতায় দুর্বল হয়ে পড়ে।

সংকীর্ণ জলপথে বড় জাহাজ সহজেই উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু হয়ে যায়। ইরানের নূর ক্রুজ মিসাইল সমুদ্রপৃষ্ঠের খুব কাছ দিয়ে উড়ে এসে আঘাত হানতে পারে, যা প্রতিরোধ করা কঠিন।

এ ছাড়া হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বিরুদ্ধে দীর্ঘসময় প্রতিরক্ষা বজায় রাখা কঠিন, কারণ যুদ্ধজাহাজের গোলাবারুদ দ্রুত ফুরিয়ে যেতে পারে। সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক শক্তি দিয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রায় অসম্ভব এবং এ কারণেই ট্রাম্পের ‘আর্মাডা’ পরিকল্পনা বাস্তবতার মুখে বারবার ব্যর্থতার ঝুঁকিতে পড়ছে। 

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..