খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক, ক্যানসার-হৃদরোগের আশঙ্কা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-১৬, | ১৩:৩৪:১৮ |

দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে বেশিরভাগ মানুষকেই বাজার থেকে শাকসবজি, পানি, শিশুখাদ্য ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। বছরের পর বছর ধরে এসব খাদ্যপণ্য জীবনরক্ষার অন্যতম উপকরণ হলেও এগুলোর বেশিরভাগেই মিলছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বিষাক্ত উপাদান। শাকসবজিতে ক্ষতিকারক সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু, পানিতে মলজাত জীবাণু, শিশুখাদ্যে নিরাপদ সীমার কয়েক গুণ বেশি টক্সিনের মতো পদার্থের উপস্থিতি মানবদেহের নীরবে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হচ্ছে। এছাড়া, রান্নার তেলে অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট, মুড়িতে ইউরিয়া, গুড়ে নিষিদ্ধ রাসায়নিক এবং বিস্কুট ও স্ট্রিট ফুডে প্রিজারভেটিভের উপস্থিতির কারণে নিরাপদ খাদ্যপণ্য খুঁজে পাওয়াই যেন দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে মানবদেহের জন্য এসব ক্ষতিকর বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি পায় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। সংস্থাটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগজনক চিত্র  প্রকাশ করা হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যদূষণ ও ভেজালের এমন প্রবণতা ঠেকানো না গেলে দেশে দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের রোগ, হৃদরোগ, থাইরয়েডের জটিলতা, শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যা এবং পানিবাহিত রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

বিএফএসএর পরীক্ষায় পানির নমুনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক ফল পাওয়া গেছে। মাইক্রোবায়োলজিক্যাল দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২১ অনুযায়ী, নিরাপদ পানিতে ফিকাল কলিফর্ম ও টোটাল কলিফর্মের উপস্থিতি শূন্য থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে পরীক্ষিত কয়েকটি জেলার পানিতে বিপজ্জনক মাত্রায় এসব জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পরীক্ষার ফল অনুযায়ী, খাগড়াছড়ির পানির প্রতি ১০০ মিলিলিটারে ৬০ সিএফইউ, দিনাজপুরে ১২০ সিএফইউ ও বাগেরহাটে ৪৩ সিএফইউ ফিকাল কলিফর্ম শনাক্ত হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফিকাল কলিফর্মের উপস্থিতির মানে হলে মলদূষণের জীবাণু পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এ ধরনের পানি নিয়মিত পান করলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, হেপাটাইটিসসহ নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন মানুষের জন্য এ ঝুঁকি অনেক বেশি।

সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হলো শিশুখাদ্যে ভারী ধাতুর উপস্থিতি। বিএফএসএর কিছু নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে, শিশুখাদ্যে ০.০৫ থেকে ০.০৭ পিপিএম পর্যন্ত সিসা পাওয়া গেছে। অথচ শিশুখাদ্যে সিসার গ্রহণযোগ্য সীমা ০.০২ পিপিএম। চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের শরীর ও মস্তিষ্ক বিকাশমান থাকে। ফলে অল্প পরিমাণ সিসাও তাদের মস্তিষ্কের বিকাশে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এতে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, শেখার ক্ষমতা হ্রাস, আচরণগত সমস্যা এবং স্নায়ুতন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।

এদিকে, শাক-সবজিকে সাধারণত রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর অন্যতম খাদ্য উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বিএফএসএর ল্যাবে পরীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকার শাক-সবজির নমুনায় ১.১৬ থেকে ২.৩৭ পিপিএম পর্যন্ত সিসা পাওয়া গেছে। অথচ শাক-সবজিতে সিসার গ্রহণযোগ্য সীমা যেখানে ০.৩ পিপিএম। এছাড়া, শাক-সবজিতে ০.৩৩ পিপিএম ক্যাডমিয়ামও শনাক্ত হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শাকসবজির কিছু নমুনায় ই কোলাই, ফিকাল কলিফর্ম এবং সালমোনেলা জীবাণুর উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিসা ও ক্যাডমিয়ামযুক্ত শাক-সবজি খেলে মানবদেহে এগুলো ধীরে ধীরে জমা হয়ে কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। একইসঙ্গে এসব ভারী ধাতু উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ায় বলেও সতর্ক করছেন তারা।

খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমেই বড় হুমকি হয়ে উঠছে বলে মনে করেন পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটেটিক্স বিভাগের প্রধান ডা. নিশাত শারমিন নিশি। তিনি বলেন, খাদ্যে যেকোনো ধরনের ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ— হৃদযন্ত্র, লিভার ও কিডনির স্বাভাবিক কার্যকারিতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দীর্ঘদিন ভেজালযুক্ত খাবার গ্রহণের ফলে হাড়ের নানা ধরনের সমস্যা, রক্তে কোলেস্টেরলের ভারসাম্যহীনতা এবং এর প্রভাবে চোখের ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ে। বিশেষ করে খাদ্যে সিসাসহ অন্যান্য বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে, আচরণগত সমস্যা (হাইপারঅ্যাক্টিভিটি) বাড়ায়। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রজননক্ষমতা হ্রাস, উচ্চ রক্তচাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত (ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন) সমস্যার পাশাপাশি শরীরে বিষাক্ত উপাদান জমার ঝুঁকি তৈরি হয়।

রাজশাহী ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে সংগ্রহ করা গুড়ের নমুনায় নিষিদ্ধ সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট; রংপুর, বগুড়া, মুন্সীগঞ্জ, বরিশাল, বান্দরবান, নরসিংদী, সুনামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর ও সাতক্ষীরার মুড়িতে ইউরিয়া এবং কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও হবিগঞ্জের বিস্কুটে নিষিদ্ধ রাসায়নিক পাওয়া গেছে। চানাচুরে অতিরিক্ত লবণ ও একটি নমুনায় অ্যাফ্লাটক্সিনও শনাক্ত হয়েছে। লবণে কোথাও আয়োডিনের ঘাটতি, আবার কোথাও অতিরিক্ত আয়োডিন পাওয়া গেছে। হলুদ ও মরিচ গুঁড়ায় অতিরিক্ত অ্যাশ, সরিষার তেলে উচ্চমাত্রার অ্যাসিড ভ্যালু, সয়াবিন তেলে ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি এবং বিভিন্ন নমুনায় অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ট্রান্সফ্যাট শনাক্ত হয়েছে।

এদিকে, দুগ্ধজাত পণ্য ও ফাস্ট ফুডের চিত্রও একই রকম। রাজবাড়ী ও চট্টগ্রামের ঘিতে কম বা অনুপস্থিত মিল্ক ফ্যাট, বরিশালের মিল্ক পাউডারে সিসা, খুলনার মধুতে অতিরিক্ত সুক্রোজ এবং বিভিন্ন জেলার মধুর নমুনায় অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ-গ্লুকোজ পাওয়া গেছে। এছাড়া, ফলের পানীয়, সফট ড্রিংক ও কৃত্রিম ফ্লেভারড পানীয়তে অতিরিক্ত বেনজোয়িক অ্যাসিড, টারট্রাজিন ও ক্যাফেইন শনাক্ত হয়েছে। কক্সবাজারের জিলাপিতে নিষিদ্ধ সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট এবং বিভিন্ন জেলার আচারে অনুমোদিত সীমার কয়েক গুণ বেশি সংরক্ষণকারী রাসায়নিকও মিলেছে। এমনকি সাতক্ষীরা ও টাঙ্গাইলের পশুখাদ্যেও জাতীয় মানের চেয়ে বেশি ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষায় আরও অনেক খাদ্যপণ্যে মান লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে। পরীক্ষায় রান্নার তেলে অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট, মুড়িতে ইউরিয়া, গুড়ে নিষিদ্ধ রাসায়নিক এবং বিস্কুট ও বিভিন্ন স্ট্রিট ফুডে ক্ষতিকর রঙ ও সংরক্ষণকারী ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে। এসব উপাদান দীর্ঘদিন শরীরে প্রবেশ করলে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, লিভারের জটিলতা এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বিএফএসএ চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সারা দেশে প্রধান কার্যালয়, আট বিভাগীয় কার্যালয় ও ৭২টি জেলা পর্যায়ের কার্যালয়ের মাধ্যমে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হচ্ছে। জেলা পর্যায়ের পাশাপাশি প্রধান কার্যালয় থেকেও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে। বিএসটিআই ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সঙ্গে যৌথ অভিযান বাড়ানোর পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং তদারকি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়; এজন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও ভোক্তাদের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

পরীক্ষার ফলাফলে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো একই ধরনের অনিয়ম দেশের বিচ্ছিন্ন কয়েকটি এলাকায় নয়, বরং বিভিন্ন জেলার নমুনায় পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যায়, খাদ্যে ভেজাল ও দূষণের সমস্যা কোনো একক উৎপাদক বা অঞ্চলের নয়, এটি উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও বাজার তদারকির সঙ্গে জড়িত একটি কাঠামোগত সমস্যা।

এ প্রসঙ্গে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খাদ্য যদি এভাবে দূষিত থাকে, তবে আমরা একটি রুগ্ন জাতিতে পরিণত হব। তখন ক্যান্সার, কিডনি, লিভার ও শ্বাসযন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে।

তিনি বলেন, শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত বা জরিমানা নয়, উৎপাদন পর্যায় থেকে নিয়মিত নজরদারি, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..